বিয়ে শুধু দুটি মানুষের সামাজিক বন্ধন নয়; এটি আল্লাহ তাআলার কাছে এক পবিত্র ইবাদত ও আমানত। এই সম্পর্ককে সম্মানিত ও নিরাপদ করতে ইসলাম নারীর জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ অধিকারটি নিশ্চিত করেছে, তা হলো মোহর। মোহর কোনো সৌজন্য উপহার নয়, কোনো লৌকিক রীতিও নয়—বরং এটি স্ত্রীর ন্যায্য ও বাধ্যতামূলক প্রাপ্য।
আজকের সমাজে মোহর নিয়ে যেমন বাড়াবাড়ি দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় অবহেলা। এই প্রেক্ষাপটে ‘মোহরে ফাতেমি’ আমাদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বরকতময় ও নববি আদর্শ হয়ে সামনে আসে।
মোহর নির্ধারণের ভিত্তি কী?
ইসলামে মোহরের জন্য কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে মোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখা সুন্নত ও বাস্তবসম্মত—
১. স্বামীর সামর্থ্য
মোহর এমন হওয়া উচিত, যা স্বামী সহজে আদায় করতে সক্ষম হন। সাধ্যের অতিরিক্ত মোহর ধার্য করা ইসলামের শিক্ষা নয় এবং তা পরবর্তীতে জুলুমের কারণ হতে পারে।
২. স্ত্রীর মর্যাদা (মোহরে মিসিল)
কনের পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা ও তার সমমানের নারীদের বিয়েতে যে পরিমাণ মোহর নির্ধারিত হয়েছে— এসবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা উত্তম।
৩. ন্যূনতম সীমা
হানাফি মাজহাব মতে, মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ১০ দিরহাম।
অর্থাৎ প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম বা ২.৬২৫ তোলা রুপা। এর কম মোহর নির্ধারণ করা জায়েজ নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন—
وَ اٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِهِنَّ نِحۡلَۃً ؕ
‘আর তোমরা নারীদের খুশিমনে তাদের মোহর প্রদান করো।’ (সুরা নিসা: আয়াত ৪)
মোহরে ফাতেমি
রাসুলুল্লাহ (সা.) তার প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-এর বিয়েতে হজরত আলী (রা.)-এর ওপর যে মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, তাকেই মোহরে ফাতেমি বলা হয়।
এটি মুসলিম সমাজে একটি আদর্শ ও বরকতময় মোহর হিসেবে সুপরিচিত।
হজরত আলী (রা.)-এর কাছে তখন বিশেষ কোনো সম্পদ ছিল না। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশে তিনি তার যুদ্ধের বর্ম বিক্রি করে মোহরের অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন—যা সরলতা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
মোহরে ফাতেমির পরিমাণ কত?
হাদিস ও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী—
মূল পরিমাণ
৫০০ দিরহাম (রুপার মুদ্রা)
ওজনের হিসাব
১ দিরহাম = ৩.০৬১৮ গ্রাম
৫০০ দিরহাম = ১,৫৩০.৯ গ্রাম বা প্রায় ১.৫৩ কেজি রুপা
তোলা/ভরি হিসেবে
প্রায় ১৩১.২৫ তোলা বা ভরি রুপা
বর্তমান বাজারমূল্যে আনুমানিক হিসাব (২০২৬)
রুপার দাম পরিবর্তনশীল। যদি প্রতি তোলা রুপার গড় মূল্য ১,৫০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে—
১৩১.২৫ × ১,৫০০ = ১,৯৬,৮৭৫ টাকা (প্রায়)
বিয়ের সময় স্থানীয় জুয়েলারি দোকান থেকে রুপার হালনাগাদ দর জেনে হিসাব করা উচিত।
মোহরে ফাতেমি কি বাধ্যতামূলক?
‘না’, মোহরে ফাতেমি নির্ধারণ করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক নয়। তবে এটি একটি মোস্তাহাব (উত্তম) আমল।
কেউ চাইলে এর চেয়ে কম (১০ দিরহামের কম নয়) বা বেশি মোহর নির্ধারণ করতে পারেন। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার পরিবারের জীবনের আদর্শ অনুসরণ করার নিয়তে অনেকেই মোহরে ফাতেমি নির্ধারণ করে থাকেন।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
মোহর পরিশোধের কোনো নিয়ত না রেখে বিয়ে করা কিংবা স্ত্রীকে না দিয়ে আজীবন ঝুলিয়ে রাখা— এটি মারাত্মক জুলুম। মোহর আদায় করা স্বামীর জন্য ওয়াজিব এবং এর জন্য তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
মোহর ইসলামে নারীর সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকার-এর প্রতীক। মোহরে ফাতেমি আমাদের শেখায়— বিয়ের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সরলতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির মধ্যে; অতিরঞ্জনে নয়। বিয়েকে বোঝা নয় বরং ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করুন।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ৪টি আমল বেশি বেশি করুন
