আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ভারত এবং জুলাইয়ে চীন ও ব্রাজিল সফরের সম্ভাবনা আছে প্রধানমন্ত্রীর। তিনটি দেশই ইতোমধ্যে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শীর্ষ পর্যায়ের এ ধরনের সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিশন রচিত হয়।
ভারতে এখন নির্বাচন চলছে এবং আগামী ৪ জুন ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর সরকার গঠন করার কথা রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা গত সপ্তাহে ঢাকা এসে প্রধানমন্ত্রীকে দেশটি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছেন।
এখন দুই পক্ষের জন্য সুবিধাজনক একটি তারিখ নির্ধারণের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে জুন মাসের শেষ সপ্তাহে এ সফর হতে পারে। যদি সেটি হয় তবে ভারতে নতুন সরকারের প্রথম বিদেশি অতিথি হবেন শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন অংশীদার হচ্ছে চীন। বাংলাদেশের বিভিন্ন বড়-বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা সহায়তা করছে। আশা করা হচ্ছে জুলাই মাসের প্রথমদিকে বেইজিং সফর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৪ সালের পর এটিই হবে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর।
গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ বছর ব্রাজিলে শীর্ষ সম্মেলন হবে এছাড়া বছরজুড়ে হবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। জুলাই মাসে নলেজ হাব বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ওই এক সফরে জি-২০ অনুষ্ঠানের পরের দিন থেকে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সফর হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওরো ভিয়েরা বলেছেন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দর্শন এক। দুই দেশের মধ্যে চমৎকার রাজনৈতিক বোঝাপড়া হবে বলে মনে করছি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমাদের সকলের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক। সবাই আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। আমাদের পররাষ্ট্র নীতিই হচ্ছে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই নীতির ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন। ভারত যেমন আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনও আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। ভারতের সাথে আমাদের যে সম্পর্ক সেটা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৈরি হয়েছে সেটির সাথে অন্য কারোর সম্পর্ক তুলনীয় না।
এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্যের প্রসঙ্গ আসার কোনো কারণ দেখিনা। আমাদের সকলের সাথেই ভালো সম্পর্ক এবং সকলেই আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সবাই বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
হাছান মাহমুদ আরও বলেন, ভারতের সাথে আমাদের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যেটি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সেনাবাহিনী রক্ত ঝরিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এক কোটি মানুষকে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেছে ভারতবর্ষের জনগণ, সেটি তো অন্য কোনো দেশ করেনি। সুতরাং ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কটা ভিন্ন মাত্রার। এছাড়া, চীন আমাদের প্রচণ্ড উন্নয়ন সহযোগী। তারা আমাদের দেশের দৃশ্যমান সকল উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রীর এটাই প্রথম ভারত সফর। দুই দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরসূচি চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনাসহ দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয়ে আলোচনা করে গেছেন। ভারতের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, এটা নতুন করে বলার কিছু নাই।
তিনি বলেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ আলাপ হতে পারে ভারতের নতুন সরকারের সাথে। আমরা সেটাই প্রত্যাশা করছি। এই সফরসূচিতে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাণিজ্যসহ নানা বিষয় উঠে আসবে বলে মনে করছি।
সংসদে সরকারি দলের চিফ হুইপ ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ভারত আমাদের সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী এবং পরীক্ষিত বন্ধু। তবে ভারত-চীন কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে এই প্রশ্নটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের ক্ষেত্র প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে আমাদের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল ছোট রাষ্ট্রের জন্য সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতি অবলম্বন করা হয়। এটি বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতি, বঙ্গবন্ধু কন্যা অভিন্ন নীতি মেনে চলে বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ডের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
তিনি বলেন, দুটি দেশের নিজস্ব কিছু টানাপোড়েন আছে। আমরা তার অংশীদার হতে চাই না। বাংলাদেশ সমমর্যাদা ও সমস্বার্থগত সম্পর্ক ভিন্ন-ভিন্নভাবে উভয় দেশের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রাখছে।
এক প্রশ্নের জবাবে এই নেতা আরো বলেন, বাংলাদেশ নিজ স্বার্থ সমুন্নত করা এবং দেশের জনগণ ও আঞ্চলিক স্বার্থ সমুন্নত রাখার জন্য কাজ করছে। সেভাবেই কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছি আমরা। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত ও চীন সফরে উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তেমন কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং আমাদের রাষ্ট্রনেতার সফর সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উম্মোচন করবে। অদূর ভবিষ্যতে চীনে আমাদের মানবসম্পদ রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

