সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব বেশ অবাক হয়েছে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ হয়েছে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ।
আপনারা জানেন যে, ভারতে আইপিএল আগামী ২৬ মার্চ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে আইপিএল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিকেট আয়োজনের অন্যতম একটি আসর। যেখানে পৃথিবীর নামকরা ক্রিকেটাররা খেলতে আসেন। সে পথ ধরেই এবারও বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা মুস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে নিজেদের দলে নেয়। পরে ভারতের কিছু হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর হুমকি ও প্রতিবাদের কারণে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে আইপিএল তথা কলকাতা নাইট রাইডার বাংলাদেশের মুস্তাফিজকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দল থেকে বাদ দেয়। বিষয়টি শুধু বাংলাদেশকে নয় সারা বিশ্বকে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। সেই তালিকায় আছে ভারতের অনেক রাজনীতিবিদ ও খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) ভারত থেকে তাদের খেলার স্থান শ্রীলঙ্কাতে স্থানান্তর করার জন্য অনুরোধ করেছে অন্যথায় বাংলাদেশ টি-২০ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে না বলে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে।
সত্যিকার অর্থে খেলাধুলা বা সংস্কৃতি কখনোই কোনো সীমানা, ধর্ম বা গোষ্ঠী দিয়ে আটকে রাখা যায় না। তাই পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাবস্থা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ থাকলেও তার প্রভাব বিশ্বকাপ খেলাগুলোতে খুব বেশি একটা দেখা যায়নি। সারা বিশ্ব সবসময়ই খেলাধুলা বা সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখে কাজ করে গেছে।
ভারতের উগ্র হিন্দু গোষ্ঠী বাংলাদেশের ভেতরে ঘটে যাওয়া দীপু চন্দ্র দাসের বিচ্ছিন্ন এক ঘটনাকে পুঁজি করে যে ঘটনার জন্ম দিয়েছে তা দুঃখজনক। বাংলাদেশের ভেতরে যে ঘটনা ঘটেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বেশ কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আমরা সাধারণ জনগণও বেশ মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। এরই মধ্যে অপরাধীদের বিচারকার্যও শুরু হয়েছে। ঘটনার সত্যতার ওপর নির্ভর করে অপরাধীদের কঠিন সাজা হবে বলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ আশা করে। এ ধরণের অনেক ঘটনাও ভারতে ঘটেছে এবং ঘটছে, কিন্তু বাংলাদেশ কখনোই সাম্প্রদায়িক বিষয় হিসেবে আলাদা করে দেখেনি বা তার প্রভাব অন্য কোনো ক্ষেত্রে ফেলতে দেয়নি। ভারতেরও উচিত ছিল খেলাধুলার বিষয়টি নিয়ে কেউ যেন রাজনীতি করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।
যাক খেলার কথায় ফিরে আসি, এ ঘটনা আসলে কী কী বিষয়ের জন্ম দিল-
- বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো অবনতির দিকে নিয়ে গেল।
- বাংলাদেশ-ভারতের মানুষের মধ্যে আরো বেশি দূরত্ব তৈরি করল।
- ভারত খেলার মধ্যে রাজনীতি প্রবেশের সুযোগ করে দিল। এই ধারা পৃথিবীর অন্যদেশগুলোর কাছেও উন্মুক্ত করে দিল।
- খেলাধুলা যে বিভিন্ন দেশ ও দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র তৈরি করতো সেটা বাঁধাগ্রস্ত করার সুযোগ করে দেওয়া হলো।
- ভারত দক্ষিণ এশিয়ার খেলার অঙ্গনে অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের বীজ রোপণ করা হলো।
- বিশ্বপরিমণ্ডলে খেলাধুলার ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান সমালোচনার জন্ম দিল এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে তাদের ইমেজকেও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করল।
- আইপিএল কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা হারাবে।এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার আইপিএলের সব সম্প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে, এতে করে আইপিএল কর্তৃপক্ষ আর্থিকভাবে কিছুটা হলেও ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
- বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট তাই আইপিএল দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় আসর বলে বিবেচিত ছিল। এ ঘটনায় ভারত হারাবে ২০ কোটি মানুষের সাপোর্ট।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো,এ ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বে খেলাধুলা ও রাজনীতিকে একই পাল্লায় মাপার মতো খারাপ উদাহরণ ভারত রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করে দিল।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
