বিশ্বকাপে নরওয়ের উদযাপন ‘ভাইকিং রো’, কী এর ইতিহাস

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:২০ পিএম

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৫ জুলাই ব্রাজিলের মুখোমুখি হচ্ছে নরওয়ে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে নরওয়ের সমর্থকদের এক অনন্য উদযাপন ‘ভাইকিং রো’। গোলের পর কিংবা ম্যাচ শেষে হাজারো সমর্থকের একসঙ্গে বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে এই উদযাপন ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের অন্যতম ভাইরাল দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কী এই ‘ভাইকিং রো’? কোথা থেকে এসেছে এর ধারণা?

কী এই ‘ভাইকিং রো’?

২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ে শুধু পারফরম্যান্সেই নয়, উদযাপনেও নজর কেড়েছে। আর্লিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডসহ পুরো দল ম্যাচ শেষে সমর্থকদের সঙ্গে ‘ভাইকিং রো’-তে অংশ নেয়। স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছাড়িয়ে এই উদযাপন ছড়িয়ে পড়েছে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, মেট্রো স্টেশন, এমনকি নরওয়ের সংসদ ভবনেও।

নরওয়েজিয়ান ভাষায় ‘রো’ অর্থ ‘বৈঠা চালাও’। উদযাপনের শুরুতে বাজানো হয় ঐতিহ্যবাহী নর্স শিঙা। এরপর সমর্থকেরা মাটিতে বসে ভাইকিংদের লংবোটে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি করেন। একজন নেতা ড্রামের তালে তালে গতি বাড়াতে থাকেন, আর হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘রো... রো...’। দূর থেকে পুরো দৃশ্যটি যেন উত্তাল সমুদ্র চিরে এগিয়ে চলা একটি বিশাল ভাইকিং জাহাজ।

এই উদযাপনের মূল বার্তা একটাই সবাই একই দিকে বৈঠা চালাচ্ছে, একসঙ্গে দলকে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে।

শত বছরের ইতিহাসের ছোঁয়া

‘ভাইকিং রো’ শুধু একটি ফুটবল উদযাপন নয়, এটি নরওয়ের ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকও। ইতিহাসবিদদের মতে, ৭০০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভাইকিং যুগে নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের যোদ্ধারা বিশাল লংবোটে করে সমুদ্রপথে বাণিজ্য, অভিযান ও যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। আজকের ‘রোয়িং’ ভঙ্গি সেই ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রারই প্রতীকী রূপ।

ভাইকিং কারা ছিলেন?

ভাইকিংরা ছিলেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী নাবিক, ব্যবসায়ী ও যোদ্ধা। আনুমানিক ৮০০ থেকে ১০৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তাদের প্রভাব ছিল। তারা শুধু লুটপাটই করেননি, নতুন বাণিজ্যপথ খুলেছেন, বসতি গড়েছেন এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকাতেও পৌঁছেছিলেন।

'ভাইকিং' শব্দটি এসেছে প্রাচীন নর্স শব্দ ‘ভিকিংগির’ থেকে, যার অর্থ জলদস্যু বা সমুদ্র অভিযাত্রী। ৭৯৩ সালে ইংল্যান্ডের লিন্ডিসফার্ন মঠে হামলার মধ্য দিয়ে ভাইকিং যুগের সূচনা বলে ধরা হয়। ১০৬৬ সালে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধে নরওয়ের রাজা হ্যারাল্ড হার্ডরাডার মৃত্যুর পর ভাইকিং যুগের অবসান ঘটে।

কে শুরু করেছিলেন ‘ভাইকিং রো’?

বর্তমান ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের রূপকার নরওয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিবেদিতপ্রাণ ফুটবল সমর্থক ওলে ফ্রয়স্টাড। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তিনি সমর্থকদের জন্য ১০-১৫টি নতুন স্লোগান তৈরি করেন। তার মধ্যেই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘ভাইকিং রো’।

প্রথমবার ২০২৬ সালের মার্চে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে এই উদযাপন দেখা যায়। তবে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর এটি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে ওঠে। আইসল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এর পর উত্তর ইউরোপের ফুটবলে এটিই এখন সবচেয়ে আলোচিত সমর্থক-সংস্কৃতি।

এখন দেখার অপেক্ষা, ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ে গোল করতে পারে কি না। যদি পারে, তাহলে বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একবার নিশ্চয়ই দেখা যাবে হাজারো মানুষের একসঙ্গে বৈঠা চালানোর সেই বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’।

AM/SN
আরও পড়ুন