অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ট

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম

পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে, তা ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই অর্থনীতিবিদ রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ট। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি নিয়ে গবেষণার জন্য সোমবার (১২ অক্টোবর) তাদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

পুরস্কারজয়ী দুই অর্থনীতিবিদের গবেষণার মূল বিষয় হলো, লাখো মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে কীভাবে একটি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। মানুষের ভোগব্যয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক বুঝতে তাদের কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব গবেষণা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নেও তাত্ত্বিক ভিত্তি জুগিয়েছে।

অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনই তাদের গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্যষ্টিক অর্থনীতি ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে, সামষ্টিক অর্থনীতির আলোচনায় উঠে আসে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, সুদের হার ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বিষয়। এই দুই ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকটের কারণ এবং তা মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের করণীয় আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হয়।

১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া রবার্ট হল যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং হুভার ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো। কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, ভোক্তাদের ব্যয় এবং অর্থনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে তাঁর গবেষণা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চক্র বিশ্লেষণেও তাঁর অবদান রয়েছে।

অন্যদিকে, ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া মাইকেল উডফোর্ট কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক। আধুনিক মুদ্রানীতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি পরিচিত মুখ। সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর কাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতি বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

উডফোর্টের বিশেষ অবদান রয়েছে নব্য কেইনসীয় অর্থনীতির বিকাশে। এ ধারার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনের ওঠানামা ব্যাখ্যার পাশাপাশি মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বোঝার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বই ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশনস অব আ থিওরি অব মনিটারি পলিসি আধুনিক মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রভাবশালী গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ঘোষণা মানুষের অর্থনৈতিক আচরণে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা উডফোর্টের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার দীর্ঘ সময় কম রাখার ইঙ্গিত দিলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়া, ব্যয় বাড়ানো কিংবা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত আগেভাগেই পরিবর্তন করতে পারে। ‘ফরোয়ার্ড গাইডেন্স’ নামে পরিচিত এ পদ্ধতি আর্থিক সংকটের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

দুই অর্থনীতিবিদের গবেষণা অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক ধাক্কার প্রভাব কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কীভাবে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অতিরিক্ত নেতিবাচক প্রভাব এড়ানো যায়, তা বিশ্লেষণে তাদের কাজের গুরুত্ব রয়েছে।

অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরস্কার। ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি প্রবর্তন করে এবং ১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মতো দেওয়া হয়। আলফ্রেড নোবেলের মূল উইলে উল্লেখিত পাঁচটি পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত না হলেও এটি অন্যান্য নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে একই মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে প্রদান করা হয়।

এবারের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করবে। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত