প্রথম দেখায় ছবি দুটিকে একই ব্যক্তির যমজ ছবি বলে ভ্রম হতে পারে। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের হিমবাহের নিচে দাঁড়িয়ে এক তরুণ সাইক্লিস্ট, কাঁধে তার প্রিয় বাইসাইকেল, চোখেমুখে পাহাড় জয়ের দৃঢ় সংকল্প। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ছবি দুটির মধ্যে সময়ের ব্যবধান দীর্ঘ ৪০ বছর। প্রথমটি ১৯৮৪ সালের, আর দ্বিতীয়টি ২০২৪ সালের।

এই অসাধারণ গল্পের নায়ক জেমি হারগ্রিভস এবং তার বাবা ফিল হারগ্রিভস। ১৯৮৪ সালে ২২ বছর বয়সে ফিল হারগ্রিভস ইংল্যান্ড থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন সিডনির উদ্দেশ্যে। ঠিক ৪০ বছর পর, নিজের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার এক সপ্তাহ পরেই সেই একই বয়সে (২২ বছর) জেমি তার বাবার সেই ঐতিহাসিক যাত্রার পুনরাবৃত্তি করার সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ ১৯ মাস ধরে ২৫ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ইংল্যান্ড থেকে পৌঁছেছেন সিডনিতে।

জেমির এই যাত্রার বিশেষত্ব ছিল তার বাবার তোলা পুরনো ছবিগুলোর হুবহু পুনর্নির্মাণ করা। এই কাজের জন্য তিনি বাবার ব্যবহৃত সেই বিখ্যাত ‘কিং অফ মার্সিয়া’ (King of Mercia) ব্র্যান্ডের একটি পুরনো মডেলের সাইকেল ফেসবুক থেকে ৮০০ ডলারে সংগ্রহ করেন। বাবার তোলা ছবিগুলোর সঠিক অবস্থান খুঁজে বের করতে জেমি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছেন। তিনি জানান, চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) ব্যবহার করে তিনি পুরনো ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ল্যান্ডস্কেপ বিশ্লেষণ করে নিখুঁত লোকেশন পিনপয়েন্ট করেছেন।

বাবার পথ অনুসরণ করলেও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জেমির রুটে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ১৯৮৪ সালে তার বাবা ইরান হয়ে যেতে পারলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে জেমিকে জর্জিয়া, রাশিয়া, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান এবং আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পৌঁছাতে হয়েছে।

জর্জিয়াতে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তার সাইকেলের ফ্রেম ভেঙে গেলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তার জনপ্রিয়তা দেখে সাইকেল কোম্পানিটি তাকে নতুন ফ্রেম পাঠিয়ে দেয়। আফগানিস্তানে তালেবান শাসনামলে ভ্রমণ নিয়ে অনেকের ভয় থাকলেও জেমি সেখানে মানুষের অবিশ্বাস্য আতিথেয়তা পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সেখানের মানুষ একজন বিদেশি পর্যটককে আশ্রয় দিতে নিজের জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা করেনি।’

জেমির বাবার তোলা সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলোর একটি ছিল এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে সাইকেল কাঁধে নেওয়ার দৃশ্য। ১৯৮৪ সালে ফিল হারগ্রিভস ছিলেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানো প্রথম দিকের সাইক্লিস্টদের একজন। জেমি শুধু সেই ছবিই পুনর্নির্মাণ করেননি, বরং তিনি অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পেও সাইকেল নিয়ে পৌঁছে এক নতুন রেকর্ড গড়েন।

বেলজিয়ামে একটি ছবির পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে জেমি এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তার বাবার ছবিতে থাকা একটি ছোট্ট ছেলেকে তিনি ৪০ বছর পর একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে খুঁজে পান এবং তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পুনরায় ছবি তোলেন।
বর্তমানে অবসরে থাকা ফিল হারগ্রিভস ইংল্যান্ডে বসে ছেলের প্রতিটি ভিডিও এবং ছবি দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। জেমি বলেন, ‘প্রতিবার যখন আমি বাবার দাঁড়িয়ে থাকার ঠিক সেই বিন্দুটিতে দাঁড়াতাম, আমার মনে হতো সময়ের ব্যবধানটা মুছে গেছে। আমি যেন ৪০ বছর আগের সেই তরুণ বাবার সঙ্গেই কথা বলছি। বাবার মুখে সারাজীবন যেসব গল্পের কথা শুনে বড় হয়েছি, সেই জায়গাগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হওয়াটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ অনুভূতি।’

