দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আরোহনের সাড়ে চার বছরের মধ্যেই আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবান গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিভক্তি দেখা দিয়েছে এবং দিন দিন তা প্রকট হয়ে উঠছে। বর্তমানে গোষ্ঠীটির কার্যত দু’টি অংশ বা ২ গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
বিবিসির সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। অনুসন্ধানে বিবিসি ১০০টির বেশি সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন তালেবানের বর্তমান ও সাবেক সদস্য, স্থানীয় সূত্র, বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিক।
তবে সংবেদনশীলতা বিবেচনায় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তার স্বার্থে কারও নাম প্রকাশ করেনি বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের তালেবানগোষ্ঠী বর্তমানে কান্দাহার গ্রুপ এবং কাবুল গ্রুপ- এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
কান্দাহার গ্রুপে আছেন আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ, শীর্ষ বিচারপতি আবদুল হাকিম হাক্কানি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী নেদা মোহাম্মদ নাদিমসহ কয়েক জন শীর্ষস্থানীয় নেতা। এই গ্রুপের সদস্যরা গোষ্ঠীটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অনুগত।
আর কাবুল গ্রুপে আছেন আফগানিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী আবদুল গনি বারাদার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদসহ কাবুল ও অন্যান্য অঞ্চলের নেতারা। এই নেতারা আখুন্দজাদার বিরোধী এবং আবদুল গনি বারাদারের প্রতি অনুগত।
দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বের ব্যাপরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত বছর সেপ্টেম্বর। ওই মাসে আখুন্দজাদা ডিক্রি জারি করে পুরো দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেন। এর কারণ হিসেবে ডিক্রিতে তিনি বলেন, ইন্টারনেটের ইসলামবিরোধ বিভিন্ন বিষয়বস্তু (কন্টেন্ট) দেশের জনগণকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে।
তার এই নির্দেশের পর তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেট বন্ধ হলেও মাত্র তিন দিনের মাথায় ফের চালু করা হয় ইন্টারনেট। বিবিসিকে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীরা জানিয়েছেন, কাবুল গ্রুপের নেতাদের চাপেই ইন্টারনেট ফের চালু করার আদেশ দিতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ।
কঠোরভাবে শৃঙ্খলা ও অনুশাসন মেনে চলা তালেবান গোষ্ঠীতে এই ঘটনা রীতিমতো বিদ্রোহের শামিল। কারণ শীর্ষ নেতার আদেশের বিরুদ্ধাচরণকে প্রথম মাত্রার অপরাধ হিসেবে গন্য করা হয় এবং তার শাস্তিও কঠোর। তবে আখুন্দজাদা এই নিয়ে পরবর্তীতে আর উচ্চ-বাচ্য করেননি।
তালেবান গোষ্ঠীর বর্তমান বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ দু’টি। প্রথমটি হলো দলের ভেতরে আখুন্দজাদার প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা। জানা গেছে, হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা সবসময় কান্দাহারে তার অনুগত নেতা-কর্মীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন। তিনি কাবুল গ্রুপের নেতাদের সাক্ষাৎ করেন না এবং ২০২১ সালের পর থেকে কৌশলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজের অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
আখুন্দজাদা ও তার অনুগতদের প্রধান লক্ষ্য আফগানিস্তানকে এক কঠোর ইসলামি আমিরাতে পরিণত করা, যা হবে আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এবং যেখানে তার প্রতি অনুগত ধর্মীয় ব্যক্তিরা সমাজের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করেন।
আর কাবুল গ্রুপের সদস্যরা আফগানিস্তানের পক্ষে কথা বলেন যা ইসলামকে কঠোরভাবে অনুসরণ করবে ঠিকই, তবে একই সঙ্গে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, দেশের অর্থনীতি গড়ে তুলবে, এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরেও মেয়ে বা নারীদের শিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা ভাববে।
গত বছর আখুন্দজাদা সমরাস্ত্র বিতরণ দপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও বিভাগ সঙ্গে পরামর্শ কান্দাহারে সরিয়ে আনার আদেশ দিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াকুব মুজাহিদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই এই আদেশ দিয়েছেন তিনি।
কয়েক দিন আগে হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার একটি অডিও টেপ ফাঁস হয়েছে। সেখানে তাকে বলতে শোনা গেছে, যদি তালেবান গোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিভক্তিতে ডুবে যায়- তাহলে আফগানিস্তানকে প্রকৃত ইসলামি এমিরেত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য থেকে পথভ্রষ্ট হবে গোষ্ঠীটি। সূত্র : বিবিসি

