সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নেমে বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। দেশটির ডানপন্থী জনতাবাদী সরকারের পতন এবং আগাম নির্বাচনের দাবিতে এই মেগা র্যালির আয়োজন করা হয়।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে ‘নভি সাদ’ রেলওয়ে স্টেশন বিপর্যয়ের মাধ্যমে, যেখানে ১৬ জন মানুষ নিহত হন। ওই ঘটনার পর দুর্নীতিবিরোধী তীব্র প্রতিবাদ এবং স্বচ্ছ তদন্তের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিলোস ভুচেভিচ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুচিক বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী এই আন্দোলন এখন ব্যাপক রূপ নিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ভুচিককে আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য করার একটি বড় ক্যাম্পেইনে পরিণত হয়েছে। এই সপ্তাহের শুরুতে ভুচিক জানিয়েছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
"শিক্ষার্থীরা জিতবেই" লেখা টি-শার্ট এবং ব্যানার নিয়ে যুব আন্দোলনের হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বিভিন্ন দিক থেকে বেলগ্রেডের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত স্লাভিজা স্কোয়ারে এসে জড়ো হন। দেশের অন্যান্য শহর থেকেও গাড়ির বহর নিয়ে মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নিতে আসেন। মায়া মিলাস মারকোভিচ নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, "শিক্ষার্থীরা তাদের তারুণ্য ও চমৎকার শক্তি দিয়ে আমাদের এখানে জড়ো করেছে। আমি বিশ্বাস করি স্বাভাবিকভাবে বাঁচার অধিকার আমাদের আছে।"
এদিকে বিক্ষোভ ঠেকাতে সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় রেল কোম্পানি শনিবার বেলগ্রেডমুখী সমস্ত ট্রেন চলাচল বাতিল করে দেয়, যাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মানুষ বিক্ষোভে যোগ দিতে না পারে।
সন্ধ্যার দিকে প্রেসিডেন্সি ভবনের কাছে এবং একটি পার্কের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ শুরু হয়। উল্লেখ্য, ওই পার্কটিতে গত বছরের মার্চ মাস থেকে প্রেসিডেন্ট ভুচিকের সমর্থকরা ক্যাম্প করে অবস্থান করছেন। সংঘর্ষ চলাকালীন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারগ্যাস এবং স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের রাস্তা থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে। জবাবে বিক্ষোভকারীরা ময়লা ফেলার বিনে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিক্ষোভের আগে ভুচিকের মুখোশধারী অনুসারীদের সাথে বড় ধরণের সহিংসতার আশঙ্কা ছিল, কারণ অতীতে তারা ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর একাধিকবার হামলা চালিয়েছে।
বেলগ্রেডের সাংবাদিক তেতিয়ানা কেকিচ আল জাজিরাকে বলেন, "এই আন্দোলনের পেছনে জনগণের বিশাল সমর্থন রয়েছে কারণ এটি সরকারের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক আন্দোলন। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিক্ষোভকারীদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা নীতি নেই এবং প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি দাঁড় করানোর মতো কোনো একক নেতা বা ব্যক্তিত্ব তাদের নেই।"
বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমনপীড়নের কারণে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কাউন্সিল অব ইউরোপের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার মাইকেল ও'ফ্ল্যাহার্টি চলতি সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে সার্বিয়া সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং শনিবারের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখার কথা জানিয়েছেন।
সার্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের চেষ্টা করলেও তারা একই সাথে রাশিয়া ও চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইইউ-এর শীর্ষ সম্প্রসারণ বিষয়ক কর্মকর্তা গত মাসে সতর্ক করে বলেছেন, ভুচিকের অধীনে এই গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের কারণে সার্বিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ইউরো (১.৮ বিলিয়ন ডলার) ফান্ডিং বা অনুদান হারাতে পারে।
শনিবারের এই বিক্ষোভের ভেন্যু 'স্লাভিজা স্কোয়ার' মূলত ২০২৫ সালের মার্চের এক বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সাক্ষী, যা হঠাৎ পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা পরবর্তীতে দাবি করেছিলেন—যদিও সরকার তা অস্বীকার করে—যে সে সময় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে 'সনিক ওয়েপন' বা শব্দাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীরা এখন পরিকল্পনা করছেন তারা এই বছরের শেষের দিকে বা আগামী বছরের নির্বাচনে ভুচিকের মুখোমুখি হবেন এবং এই ডানপন্থী জনতাবাদী সরকারের পতন ঘটাবেন। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ভুচিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং সরকারপন্থী মিডিয়াগুলো সমালোচকদের "সন্ত্রাসী" এবং দেশের ধ্বংসকামী "বিদেশী এজেন্ট" হিসেবে আখ্যায়িত করছে, যা দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মার্কিন পতাকায় ইরানের মানচিত্র ঢেকে দিলেন ট্রাম্প!