ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বজনদের খোঁজে হাজার হাজার পরিবার যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে আহত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৬০ জন ছাড়িয়েছে। উত্তর ভেনেজুয়েলার ডজন ডজন হাসপাতাল ও শপিং মলসহ শত শত ভবন ধসে পড়ায় আহতদের অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাজধানী কারাকাসসহ অন্তত ১ হাজার অবকাঠামো সাইট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে ডা. পেড্রো জাভিয়ের ফার্নান্দেজ জানান, স্বাভাবিক সময়েই যেখানে হাসপাতালে ওষুধ ও সরঞ্জামের তীব্র সংকট থাকে, সেখানে এই জাতীয় দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া অন্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ও রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকর্মীরা খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন।
গত বুধবার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল ৭.৫ মাত্রার (যা এক শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী)। রাজধানী কারাকাসের উত্তরের অঞ্চল ‘লা গুয়াইরা’ (La Guaira) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অঞ্চলেই দেশটির অন্যতম প্রধান বিমানবন্দর ‘সিমন বলিভার ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর’ অবস্থিত।
ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, মৃতের সংখ্যা ৯২০ এ পৌঁছেছে এবং এখনও অন্তত ১৭২ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত কেবল লা গুয়াইরা থেকেই ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রথম ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত ২১৪ বার আফটারশক (অনুকম্পন) অনুভূত হয়েছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল ইয়ান ইগেল্যান্ড বলেন, "কয়েক দশকের বিনিয়োগের অভাব এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে ভেনেজুয়েলা এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।"
লা গুয়াইরার বাসিন্দা নাতাশা দিয়াজ জানান, একটি শপিং মলে ম্যানিকিউরিস্ট হিসেবে কর্মরত তাঁর ২২ ও ২৩ বছর বয়সী দুই মেয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, "ওরাই আমার সব, দয়া করে ওদের আমার বুকে ফিরিয়ে দিন।"
এরই মাঝে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিন ভাইবোনের অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার এক ভিডিও ফুটেজ দেশবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। ধূলিসূসরিত ও কংক্রিটের চাঁইয়ের নিচ থেকে একে একে তিন বোনকে জীবিত উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মীরা।
অন্যদিকে, ফুটবলার হেক্টর বেলোর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর স্ত্রী আন্দ্রেয়া নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে তাদের একমাত্র কন্যাসন্তানকে বাঁচিয়ে গেছেন। হেক্টর ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, "আমি আমাদের মেয়েকে বড় হয়ে বলব, কীভাবে তার সাহসী মা নিজের শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে গেছে।" এছাড়া এই দুর্যোগে ১ জন পর্তুগিজ, ২ জন ব্রাজিলিয়ান এবং ৪ জন স্প্যানিশ নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্পেনের আরও ১০৬ জন নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার এই সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, সাহায্য আসছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডশায়ার থেকে মার্সিসাইড ফায়ার অ্যান্ড রেস্কিউ-এর নেতৃত্বে ১৪টি ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ দল, উদ্ধারকারী কুকুর ও ড্রোন নিয়ে একটি সামরিক বিমান ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো এবং সুইজারল্যান্ড তাদের দল পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ১৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান এবং যুদ্ধজাহাজ ও পরিবহন বিমান মোতায়েন করেছে।
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়টি ভেনেজুয়েলার এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আঘাত হানল। মাত্র ছয় মাস আগে, ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বামপন্থী নেতা নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে মার্কিন বাহিনী আটক করে মাদক পাচারের অভিযোগে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। এরপর মাদুরোর সহযোগী ডেলসি রদ্রিগেজ দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। তবে বিরোধী সমর্থকরা আশা করেছিলেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে ক্ষমতায় বসাবে। নির্বাসিত বিরোধী নেতা লিওপোল্ডো লোপেজ বিবিসিকে বলেন, দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকারি উদ্ধারকাজের অক্ষমতা স্পষ্ট হলেও, সাধারণ নাগরিকরা যেভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন তা প্রশংসনীয়। সূত্র: আল জাজিরা
ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা, হুমকিতে যুদ্ধবিরতি
'ইরান হামলা চালালে ‘সবচেয়ে বড় ভুল’ হবে'
ইরান-লেবানন-পশ্চিম তীরে দেড় কোটি ডলার অনুদান দেবে জাপান
'হরমুজে বিকল্প রুটে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবেনা ইরান'