অনশন ভাঙাতে ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নিলো পুলিশ

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

ভারতে টানা ২০ দিন অনশনে থাকা সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে দিল্লির আন্দোলনস্থল থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। তবে তার অনুপস্থিতিতেও আন্দোলন চলবে এবং নির্ধারিত সময়েই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনের নেতারা।

৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন করছিলেন। আন্দোলনকারীরা আগামী ২০ জুলাই ভারতের সংসদের উদ্দেশে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে গত ২০ দিন ধরে শুধু পানি ও লবণ খেয়ে অনশন চালিয়ে আসছিলেন ওয়াংচুক। এতে তার ওজন ৯ কেজির বেশি কমে যায় এবং শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে।

ওয়াংচুককে সরিয়ে নেওয়ার পর তার পরিবর্তে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তিনি জানিয়েছেন, সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা পরিকল্পনামাফিকই হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগও দাবি করেন।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিপকে বলেন, শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে তিনি এক বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন। এ সময় পুলিশ সেখানে গিয়ে তাকে বের হতে বাধা দেয়।

শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার কিছু আগে আন্দোলনস্থল থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মঞ্চে উঠে ওয়াংচুককে ঘিরে ফেলেন। বাধা দিতে গেলে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বিছানার চাদর দিয়ে তাকে ঢেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরে ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, তাকে দিল্লির সাফদারজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

তিনি লেখেন, 'আমার, পরিবারের সদস্যদের এবং গত ২০ দিন ধরে তার চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ করা চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া তাকে মুখে বা শিরায় কোনো ওষুধ বা তরল দেওয়া যাবে না।'

সাফদারজং হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. চারু বাম্বা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, ওয়াংচুক সম্পূর্ণ সচেতন ও স্থিতিশীল আছেন।

তিনি বলেন, 'দীর্ঘ অনশনের কারণে তিনি কিছুটা দুর্বল এবং সামান্য পানিশূন্যতায় ভুগছেন। তবে তার সব গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক স্বাভাবিক রয়েছে। তাকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।'

দিল্লি পুলিশের উপকমিশনার শচীন শর্মা জানান, আদালতের নির্দেশ, চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিল।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও অনশন ভাঙতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ওয়াংচুক। কয়েক দিন আগে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, 'শরীর হয়তো দুর্বল হয়ে গেছে, কিন্তু মনোবল এখনও অটুট।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে সংসদে গিয়ে গণতন্ত্রের মঞ্চে আমাদের দাবি তুলে ধরব।' এমনকি রসিকতা করে বলেছিলেন, পদযাত্রার আগেই যদি তার মৃত্যু হয়, তবে তার ‘আত্মাও’ সেই মিছিলে অংশ নেবে।

তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি পদযাত্রায় অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, 'ওয়াংচুককে সরিয়ে নিলেই আন্দোলন থেমে যাবে এমনটা ভাবা ভুল। ২০ জুলাই আমরা সংসদের দিকে পদযাত্রা করবই।'

চলতি বছরের মে মাসে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র যাত্রা শুরু হয়। পরে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমর্থন পায় এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সদস্যরাও আন্দোলনে যোগ দেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশ্নফাঁসের দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে তিনি আন্দোলনকারীদের ‘বিশৃঙ্খলাকারীদের বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেছেন। এখন পর্যন্ত মোদি সরকারও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেনি।

শনিবারের ঘটনার পর আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আরও জোরালো করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগও দাবি করেছেন।

এদিকে ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ভারতের কয়েকটি বিরোধী দলের সংসদ সদস্য তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা ঘটনাটিকে ‘রাষ্ট্রীয় জবরদস্তি’ এবং ‘গণতন্ত্রের ওপর আঘাত’ বলে অভিহিত করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার আন্দোলনস্থলে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি সরকারকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'প্রতি বছর প্রশ্নফাঁসের খেসারত দিচ্ছে দেশের তরুণরা। শিক্ষার্থীদের এবং ওয়াংচুকের কথা সরকারের শোনা উচিত।'

একই সঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তার জায়গায় সোনম ওয়াংচুককে নিয়োগ দেওয়া উচিত।

সূত্র: বিবিসি

AM
আরও পড়ুন