জলবিদ্যুতের দেশ নেপাল, এক বন্যাতেই বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ অবকাঠামো

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৪ এএম

হিমালয়ের নদী ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছে নেপাল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহধস সেই কৌশলের বড় একটি দুর্বলতা সামনে এনেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ওপর আঘাত হেনেছে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধস। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামো, আটকা পড়েছেন শত শত কর্মী এবং জাতীয় বিদ্যুৎ সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়েছে।

২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উজানে হিমবাহ ও পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানি ভয়াবহ গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে নদী উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা বিধ্বস্ত হয়। গ্রাম, সড়ক, সেতুর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাধিক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এ বিপর্যয়ে সম্পত্তি, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৮৭.৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি বা ২৫৬ কোটি ডলার।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কর্মীদের নিখোঁজ হওয়া। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ত্রিশূলী নদী অববাহিকার ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৯০০ মানুষ আটকা পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই প্রকল্পের সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে উদ্ধার অভিযান থেকে আশার খবরও এসেছে। শুক্রবার Upper Trishuli 3A জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ থেকে নয় দিন পর দুই কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীরা ভেতর থেকে ক্ষীণ আওয়াজ শুনে তাদের অবস্থান শনাক্ত করেন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

বন্যার আঘাতে নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থারও বড় ক্ষতি হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর কারণে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ সাময়িকভাবে হারিয়েছে নেপাল। অর্থাৎ, যে জলসম্পদকে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে তার অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেছে, সেই একই নদী ও পাহাড়ি পরিবেশ এখন বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

নেপালের জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। পাহাড়ি নদীগুলোর বিপুল প্রবাহ ও উচ্চতার পার্থক্য দেশটিকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী করেছে। তাই গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিকল্পনাও জোরদার করেছে কাঠমান্ডু।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হিমবাহ গলে যাওয়া, পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়া, আকস্মিক অতিবৃষ্টি এবং হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনায় এসব পরিবর্তনকে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

এখানেই নেপালের ‘জলবিদ্যুৎনির্ভর’ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জলবিদ্যুৎ নিজে কোনো ভুল জ্বালানি বা প্রযুক্তি নয়; বরং এটি নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সমস্যাটি হলো—একটি দেশের বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির বড় অংশ যদি একই ধরনের ভৌগোলিক ঝুঁকির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে একটি বড় দুর্যোগ পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে আঘাত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের একটি পরামর্শ হলো, ভবিষ্যতের প্রকল্পে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নয়, দুর্যোগ সহনশীলতাকেও প্রধান বিবেচনা করা। কোথায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, নদীর গতিপথ কীভাবে বদলাতে পারে, পাহাড়ধস বা হিমবাহধসের সম্ভাবনা কতটা, জরুরি সময়ে কর্মীদের কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে—এসব বিষয়কে প্রকল্প অনুমোদনের শুরু থেকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎসহ বিকেন্দ্রীভূত অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস বাড়ানোর কথাও আলোচনায় এসেছে। এতে একটি নির্দিষ্ট নদী বা অঞ্চলের ওপর জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। দুর্যোগের সময় স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতেও এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই নেপালের জন্য শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি ভবিষ্যৎ অবকাঠামো পরিকল্পনার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। জলবিদ্যুৎকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা সম্ভব, কিন্তু জলবায়ু ও পাহাড়ি দুর্যোগের পরিবর্তিত বাস্তবতা উপেক্ষা করে নয়।

হিমালয়ের নদী নেপালের সম্পদ—কিন্তু সেই নদীই যে ভয়াবহ শক্তিতে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, ত্রিশূলী উপত্যকার সাম্প্রতিক বিপর্যয় তার নির্মম স্মরণ করিয়ে দিল।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন