আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণকে ‘দারুণ বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আয়ারল্যান্ড সফরের সময় অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত এই ইস্যুতে নিজের অবস্থান জানান তিনি।
ডাবলিনে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণ তিনি দেখতে চান।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কোনো সমস্যা তৈরি করতে চাই না, তবে আমি এটিকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চাই। শেষ পর্যন্ত এটি ঘটবে। এখনই হলে মন্দ কী?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি একটি দারুণ বিষয় হবে।’ তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প স্বীকার করেন, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যেরও মতামত থাকবে।
পরবর্তী এক অনুষ্ঠানে দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প অবশ্য স্বীকার করেন, আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণ নিয়ে ‘সহজ কোনো উত্তর নেই’।
দীর্ঘ সংঘাতের স্পর্শকাতর ইস্যু
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ—এটি আয়ারল্যান্ডের অংশ হবে, নাকি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকবে—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই কয়েক দশক ধরে সেখানে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত হয়েছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ছয়টি কাউন্টিতে প্রোটেস্ট্যান্ট জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং অঞ্চলটি যুক্তরাজ্যের অংশ। অন্যদিকে আইরিশ জাতীয়তাবাদীদের বড় অংশ, যাদের বেশিরভাগই ক্যাথলিক, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে। বিপরীতে ইউনিয়নপন্থীরা ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চান।
এই মতপার্থক্য থেকেই ‘দ্য ট্রাবলস’ নামে পরিচিত দীর্ঘ সহিংসতার সূত্রপাত হয়। এতে উভয় পক্ষের সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি ব্রিটিশ সেনারাও জড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের বড় পরিসমাপ্তি ঘটে। চুক্তিটি সম্পাদনে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে উত্তর আয়ারল্যান্ড শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অংশ থাকবে নাকি আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
চুক্তি অনুযায়ী, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দিতে পারেন বলে মনে হয়, তাহলে পুনরেকত্রীকরণ নিয়ে গণভোট আয়োজনের সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, জনমত এমন পর্যায়ে পরিবর্তিত হলেই কেবল যুক্তরাজ্য গণভোটের বিষয়টি বিবেচনা করবে, যখন বিষয়টি আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
ট্রাম্পের মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বার্নহ্যামের কার্যালয় ওই বক্তব্যের দিকেই ইঙ্গিত করেছে।
ব্রিটেনকে চাপে রাখার বার্তা?
ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফরের মন্তব্যকে কেউ কেউ ব্রিটেনের প্রতি পরোক্ষ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন। বিশেষ করে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে সাম্প্রতিক ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণ প্রসঙ্গটিও আলোচনায় এসেছে।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত একটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল। আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জটির ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি করে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সম্প্রতি সেই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ট্রাম্প এর আগেও ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। শনিবার তিনি ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার দখলের পর ব্রিটিশ বাহিনী যেভাবে দ্বীপপুঞ্জ পুনর্দখল করেছিল, ভবিষ্যতে ব্রিটেন একইভাবে তা করতে পারবে কি না—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের বিষয়ে ব্রিটেনের অবস্থান নিয়েও ট্রাম্প অসন্তুষ্ট। ফলে আয়ারল্যান্ড ও ফকল্যান্ড নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যকে লন্ডনের প্রতি চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
আইরিশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক
ডাবলিনে আইরিশ প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনলির সঙ্গেও বৈঠক করেন ট্রাম্প। কনলি একজন বামপন্থী রাজনীতিক এবং ২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় তাঁর আয়ারল্যান্ড সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন রয়েছে কনলির। অতীতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করেছেন এবং ট্রাম্পকে ‘বুলি’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে কনলি জানান, তিনি ট্রাম্পকে আইরিশ জনগণের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—যুদ্ধ ও গণহত্যাকে কখনোই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
ট্রাম্পকে কয়েকটি উপহারও দেন তিনি। এর মধ্যে ছিল প্রয়াত আইরিশ কবি মাইকেল লংলির একটি সংকলন, যাতে ‘Ceasefire’ নামের একটি সনেট রয়েছে।
ডাবলিনে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ
ট্রাম্পের সফর ঘিরে ডাবলিনে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফিনিক্স পার্কের চারপাশে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেখানে আইরিশ প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবন রয়েছে।
ট্রাম্প শহর ছাড়ার পর ডাবলিনের কেন্দ্রীয় এলাকায় হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল আইরিশ ও ফিলিস্তিনি পতাকা। বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের একজন পলা বাটলার বলেন, নারীদের অধিকার, শরণার্থী ও অভিবাসীদের বিষয়ে ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করতেই তিনি বিক্ষোভে এসেছেন।
ট্রাম্পের আইরিশ ঐক্যের পক্ষে মন্তব্যও তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। বাটলারের ভাষায়, আয়ারল্যান্ডের ঐক্য সম্পর্কে ট্রাম্প যতটা জানেন, তার চেয়ে বেশি তিনি নিজের ‘কনিষ্ঠ আঙুলে’ জানেন।
পারিবারিক ব্যবসা ও ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফর
ট্রাম্পের ছেলে এরিক ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডে তাদের পরিবারের উপস্থিতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আইরিশ সম্প্রচারমাধ্যম আরটিইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ডুনবেগের গলফ কোর্সটি ওই এলাকার সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফর তাঁর সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের মিশ্রণের বিষয়টিও আবার সামনে এনেছে। তিনি নিয়মিত নিজের গলফ ক্লাবগুলোতে সময় কাটান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনেও অংশ নেন।
গত বছর স্কটল্যান্ড সফরের সময়ও তিনি নিজের গলফ ক্লাবে খেলেছিলেন এবং পরে অ্যাবারডিনশায়ারে একটি নতুন ট্রাম্প গলফ কোর্স উদ্বোধন করেন। সেই সফরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন।
আয়ারল্যান্ডে পরবর্তী রাইডার কাপ অনুষ্ঠিত হলে সেখানে ফিরবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘অবশ্যই ফিরব।’
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এবারের আয়ারল্যান্ড সফর শুধু বাণিজ্য ও কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ, ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পর্ক, ফকল্যান্ড ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্য এবং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ—সব মিলিয়ে তাঁর মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ওসামা বিন লাদেনের হামলার তালিকায় ছিল ভারত: সিআইএ নথি
সৌদির তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা, তদন্তে ইরানের সহযোগিতা চাইল ইরাক
'হরমুজ প্রণালি এখনই খুলছে না'
রাজধানীসহ যেসব এলাকায় বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস