সেপ্টেম্বর মানেই আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের ব্যস্ত সময়। প্রতিবছর এই সময়ে একের পর এক গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ও হ্যারিকেন তৈরি হতে থাকে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ছবি দেখাচ্ছে। হ্যারিকেন মৌসুমের সবচেয়ে সক্রিয় সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আটলান্টিক অববাহিকায় একটি হ্যারিকেনও তৈরি হয়নি।
শুধু তাই নয়, আধুনিক স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের যুগে মৌসুমের প্রথম হ্যারিকেন তৈরির ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ অপেক্ষার নজিরও নেই। ১৯৬৬ সালে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে হ্যারিকেন পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর এর আগে সবচেয়ে দেরিতে প্রথম হ্যারিকেন তৈরি হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বর—২০০২ ও ২০১৩ সালে। ২০২৬ সালে সেই রেকর্ডও পেরিয়ে গেছে।
তবে এই অস্বাভাবিক শান্ত পরিবেশকে সরাসরি বড় কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না আবহবিদেরা। বরং শক্তিশালী এল নিনো এবং তার ফলে আটলান্টিকের বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশের পরিবর্তনকেই এ বছরের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরেও হ্যারিকেন নেই
আটলান্টিকের হ্যারিকেন মৌসুম সাধারণত ১ জুন থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলে। এর মধ্যে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে সক্রিয় সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে ঝড়ের কার্যক্রম সাধারণত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
কিন্তু এবার সেই সময়েও আটলান্টিক অনেকটাই শান্ত। ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহাসাগরজুড়ে মাত্র পাঁচটি নামকরণযোগ্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় তৈরি হয়েছিল। এর কোনোটিই হ্যারিকেনে পরিণত হয়নি। এমনকি সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় হারিকেন সেন্টারের পর্যবেক্ষণেও পরবর্তী সাত দিনে নতুন কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সিস্টেম তৈরির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা ছিল না।
এই পরিস্থিতিই আটলান্টিককে স্যাটেলাইট যুগের সবচেয়ে দীর্ঘ হ্যারিকেন-বিহীন শুরুর দিকে নিয়ে গেছে।
কেন এত শান্ত আটলান্টিক?
এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে এল নিনো। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জলবায়ুগত ঘটনা। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের ধরনেও এর প্রভাব পড়ে।
এবারের এল নিনো বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের Climate Prediction Center-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শরৎ ও শীত মৌসুমে শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও ৭৫ শতাংশ বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এল নিনো কীভাবে আটলান্টিকের ঝড় কমায়?
এল নিনোর প্রভাবে আটলান্টিক অঞ্চলের ওপরের বায়ুমণ্ডলে শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ বা vertical wind shear তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ও ওপরের স্তরের বাতাসের গতি ও দিকের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় শক্তিশালী হওয়ার জন্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত wind shear ঝড়ের গঠনকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। ফলে কোনো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সিস্টেম তৈরি হলেও সেটি দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায় না।
এই কারণেই এল নিনো সাধারণত আটলান্টিকে হ্যারিকেন কার্যক্রম কমিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের পরিস্থিতিতেও সেই প্রভাব স্পষ্ট বলে আবহবিদেরা মনে করছেন।
প্রশান্ত মহাসাগরে আবার উল্টো চিত্র
আটলান্টিক যখন অস্বাভাবিক শান্ত, তখন প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে বেশি।
এর পেছনেও এল নিনোর প্রভাব রয়েছে। এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং সেখানে ঝড়ের বিকাশের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ফলে একই জলবায়ুগত ঘটনা আটলান্টিকে ঝড় কমাতে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে ঝড় বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাহলে কি বিপদের আশঙ্কা নেই?
আটলান্টিক শান্ত থাকার অর্থ এই নয় যে পুরো হ্যারিকেন মৌসুম ঝুঁকিমুক্ত। মৌসুম এখনও শেষ হয়নি। নভেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন ঝড় তৈরির সম্ভাবনা থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঝড়ের সংখ্যা কম হলেও একটি শক্তিশালী হ্যারিকেন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। তাই মৌসুমে ঝড়ের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকা মানেই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি শূন্য হয়ে যাওয়া নয়।
এ কারণেই আবহবিদেরা শুধু ঝড়ের সংখ্যা নয়, সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা, wind shear এবং সম্ভাব্য ঝড়ের গতিপথও পর্যবেক্ষণ করেন।
পরের মৌসুম নিয়ে কেন আলোচনা?
এ বছরের অস্বাভাবিক শান্ত পরিস্থিতির মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি প্রশ্নও উঠছে—পরবর্তী আটলান্টিক হ্যারিকেন মৌসুম কেমন হতে পারে?
এর উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একটি মৌসুমের অস্বাভাবিক আচরণ পরবর্তী মৌসুমের ঝড়ের সংখ্যা বা শক্তি সরাসরি নির্ধারণ করে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন হ্যারিকেনের সম্ভাব্য তীব্রতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে আটলান্টিকের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে উষ্ণ থাকার প্রবণতা বিজ্ঞানীদের নজরে রয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ মৌসুমের পূর্বাভাসে এল নিনো-লা নিনার মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের পাশাপাশি সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতাকেও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
‘শান্ত’ আটলান্টিকের আসল রহস্য
২০২৬ সালের আটলান্টিক হ্যারিকেন মৌসুমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য তাই ঝড়ের অনুপস্থিতি। সেপ্টেম্বরের চূড়ান্ত সক্রিয় সময়েও একটি হ্যারিকেন তৈরি না হওয়া স্যাটেলাইট যুগের একটি বিরল রেকর্ড।
তবে এই নীরবতাকে রহস্যজনক কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের নিশ্চিত সংকেত হিসেবে দেখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো নেই। বরং শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে আটলান্টিকের প্রতিকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশের সম্পর্কই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।
অর্থাৎ, আপাতত আটলান্টিকের ‘নিস্তব্ধতা’ বিজ্ঞানীদের কাছে আতঙ্কের চেয়ে আবহাওয়া ও জলবায়ুর একটি অসাধারণ প্রাকৃতিক পরীক্ষা হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত নজরদারি চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
সরকারি তথ্য ব্যবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক
যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ায় প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন
ইরান যুদ্ধ নিয়ে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প