যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবার সামরিক অস্ত্রের বদলে অর্থনীতির একটি সমীকরণকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে লক্ষ্য করে তিনি টেলর সমীকরণের আদলে একটি ব্যঙ্গাত্মক সূত্র প্রকাশ করেছেন।
১৬ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে গালিবাফ প্রশ্ন তোলেন—সুদের হার বাড়ালে কি হরমুজ প্রণালি খুলবে, কিংবা বিশ্ববাজারে এক ব্যারেল তেলও সরবরাহ হবে? তাঁর বার্তার মূল লক্ষ্য ছিল, সুদের হার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া গেলেও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে তৈরি সরবরাহ সংকট তা দিয়ে সমাধান করা যাবে না।
গালিবাফ প্রচলিত টেলর রুলকে পরিবর্তন করে তাঁর নিজস্ব ‘Straits Taylor Rule’ উপস্থাপন করেন। এতে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের পাশাপাশি স্ট্রেইট অব হরমুজ (SOH) এবং বাব আল-মান্দেবের মতো সামুদ্রিক chokepoint বা সংকীর্ণ নৌপথের ঝুঁকিকেও যুক্ত করা হয়েছে।
টেলর রুল কী?
টেলর রুল হলো অর্থনীতিবিদ জন টেলরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নীতিগত নির্দেশক সূত্র, যা মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির সক্ষমতার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সম্ভাব্য সুদের হারের মাত্রা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো বাধ্যতামূলক আইন নয়; কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা সুদের হার নির্ধারণের সময় আরও অনেক অর্থনৈতিক তথ্য ও ঝুঁকি বিবেচনা করেন।
গালিবাফের ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণে মূল বার্তাটি হলো—যদি যুদ্ধ ও নৌপথের বাধার কারণে তেলের সরবরাহ কমে যায় এবং জ্বালানি মূল্য বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়, তাহলে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে সেই সরবরাহ সংকট দূর করা সম্ভব নয়। আল জাজিরার বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদদেরও একই ধরনের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।
ফেডের সুদের হার বাড়ানোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কোথায়?
গালিবাফের পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পরই ফেডারেল রিজার্ভ ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার বাড়িয়ে নীতিগত হার ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করে। এটি তিন বছরের মধ্যে ফেডের প্রথম সুদহার বৃদ্ধি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি মার্কিন মূল্যস্ফীতির হিসাবকে প্রভাবিত করছে। তেলের দাম ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে—এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার।
তবে এখানেই গালিবাফের ব্যঙ্গের সীমাটিও স্পষ্ট। ইরান মার্কিন সুদের হার ‘নির্ধারণ’ করছে—এমন অর্থনৈতিক বাস্তবতা নেই। ফেডারেল রিজার্ভই যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি ও নীতিগত সুদের হার নির্ধারণ করে। ইরানের যুদ্ধ ও হরমুজ পরিস্থিতি সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা বৃহত্তর অর্থনৈতিক কারণগুলোর একটি হতে পারে, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়।
হরমুজের অর্থনৈতিক প্রভাব
গালিবাফের বক্তব্যের পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে এ পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বরের আগের দিন মাত্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে, যেখানে ১০ দিনের গড় ছিল ১৭টি।
হরমুজ দিয়ে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় নৌ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে তেল ও জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বৈশ্বিক বাজারে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন হিসাব তৈরি করেছে।
গালিবাফের আসল বার্তা
গালিবাফের ‘Straits Taylor Rule’ কোনো বাস্তব কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং অর্থনৈতিক চাপের একটি ব্যাখ্যা। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো—ওয়াশিংটন সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।
আল জাজিরার উদ্ধৃত বিশ্লেষক নেগার মরতাজাভির মতে, গালিবাফ প্রচলিত টেলর রুলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব যুক্ত করে বোঝাতে চেয়েছেন যে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়ের একটি অংশ সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। তাঁর মতে, এটি ইরানের অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি রাজনৈতিক বার্তা—মার্কিন সুদের হার নিয়ন্ত্রণের বাস্তব দাবি নয়।
অর্থাৎ, গালিবাফের ‘গাণিতিক মিসাইল’-এর লক্ষ্য ফেডকে সত্যিই সুদের হার নির্ধারণে বাধ্য করা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, তেলের বাজার এবং হরমুজ সংকটকে একই সমীকরণে এনে যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।
মক্কাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে সৌদি আরব: হুথি নেতা
সৌদিকে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন ট্রাম্প প্রশাসনের
ইরান ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্প এ পর্যন্ত কতবার দিলো?