ইরান ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্প এ পর্যন্ত কতবার দিলো?

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২০ এএম

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দেশটির অবকাঠামো, বিদ্যুৎব্যবস্থা এমনকি পুরো দেশকে ধ্বংস করার মতো কঠোর হুমকি দিয়েছেন।

আল-জাজিরার একটি বিশ্লেষণে এমন ছয়টি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা দেশটির শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসের সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

তবে এই ছয়টি ঘটনাকে ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এগুলোকে আলজাজিরার বাছাই করা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

২১ মার্চ: বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘ধ্বংস’ করার হুমকি

২১ মার্চ ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সময়সীমা দেন। তা না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে একে একে সেগুলোতে আঘাত করা এবং ‘ধ্বংস’ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরদিন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

১ এপ্রিল: ‘স্টোন এজে’ ফেরানোর হুমকি

১ এপ্রিল টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরান কোনো চুক্তিতে না এলে দেশটিকে ‘স্টোন এজে’ ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে আরও হামলার ইঙ্গিত দেন তিনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় ট্রাম্প ইরানের নৌ ও বিমান সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রভাবের কথা তুলে ধরছিলেন এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালানোর হুমকি দেন।

৫ এপ্রিল: ‘নরকের মুখোমুখি’ হওয়ার সতর্কতা

৫ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে আবারও সময়সীমা দেন ট্রাম্প। এবার তিনি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার সম্ভাবনার কথা বলেন এবং ইরানকে ‘নরকের মুখোমুখি’ হওয়ার সতর্কতা দেন।

এই পর্যায়ে সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন বা প্রভাবাধীন এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ চলাচল করে।

৬ এপ্রিল: ‘এক রাতেই পুরো দেশ’ ধ্বংসের কথা

৬ এপ্রিল ট্রাম্প আরও কঠোর বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, চাইলে পুরো ইরানকে এক রাতের মধ্যে ধ্বংস করা সম্ভব।

তিনি এমন একটি পরিকল্পনার কথা বলেন, যাতে ইরানের প্রতিটি সেতু ধ্বংস এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অচল করে দেওয়া হবে। পরদিনের বক্তব্যে তিনি ইরানের অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলার পরিকল্পনার কথাও পুনরায় উল্লেখ করেন।

৭ এপ্রিল: ‘একটি পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসের হুমকি

৭ এপ্রিল ট্রাম্পের বক্তব্য আরও ব্যাপক অর্থ বহন করে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘একটি পুরো সভ্যতা’ ওই রাতেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং তা আর কখনো ফিরে আসবে না।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, একই সময় ট্রাম্প ইরানের সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলার পরিকল্পনার কথাও বলেন।

পরদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। ফলে ৭ এপ্রিলের হুমকিগুলো যুদ্ধবিরতির আগে সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে।

১৭ সেপ্টেম্বর: ‘তাদের ধ্বংস করব কি না?’

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা সামনে আনেন।

১৭ সেপ্টেম্বর অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর সামনে একটি ‘বড় সিদ্ধান্ত’ আসছে—ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে তাদের ‘ধ্বংস’ করবেন কি না।

ট্রাম্প বলেন, “Do I want to go in and annihilate them, or do I not?” একই সঙ্গে তিনি বলেন, এটি বড় সিদ্ধান্ত এবং তাঁর কাছ থেকে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।

হুমকির ভাষা বদলেছে, লক্ষ্যও বদলেছে

ট্রাম্পের বক্তব্যগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, হুমকির পরিধি সময়ের সঙ্গে বদলেছে। মার্চে মূলত ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। এপ্রিলের শুরুতে হুমকি ছড়িয়ে পড়ে সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বৃহত্তর অবকাঠামোর দিকে। ৭ এপ্রিলের বক্তব্যে তিনি ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসের কথা বলেন।

সেপ্টেম্বরে এসে বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু আবার কিছুটা বদলে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ‘annihilate’ বা ধ্বংস করার সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তখন যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি ছিলেন।

নতুন করে বড় হামলা নাকি কূটনীতি?

সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ বক্তব্যের সময় পরিস্থিতি এপ্রিলের তুলনায় আলাদা। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্প একই সময়ে উপসাগরীয় ছয় দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করছেন এবং ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তাদের মতামত শুনতে চান।

অন্যদিকে ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। ফলে তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যে একদিকে বড় ধরনের সামরিক হামলা পুনরায় শুরুর সম্ভাবনা, অন্যদিকে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা—দুই পথই খোলা রয়েছে।

তাহলে মোট কতবার?

আলজাজিরার তালিকা অনুযায়ী ছয়টি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো—২১ মার্চ, ১ এপ্রিল, ৫ এপ্রিল, ৬ এপ্রিল, ৭ এপ্রিল এবং ১৭ সেপ্টেম্বর।

তবে ‘ট্রাম্প ঠিক ছয়বার ইরান ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। কারণ বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্যে ইরানের নির্দিষ্ট অবকাঠামো, সামরিক সক্ষমতা, সরকার বা পুরো দেশ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন হুমকি এসেছে। কোন বক্তব্যকে ‘ধ্বংসের হুমকি’ হিসেবে গণনা করা হবে, তার সংজ্ঞার ওপর সংখ্যাটিও পরিবর্তিত হতে পারে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ১৭ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যটি অবশ্য দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কয়েক মাসের সংঘাত ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সামরিক বিকল্প পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। একই সময়ে কূটনৈতিক পথও আলোচনায় রয়েছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন