প্রামাণ্যচিত্র নাজা'র নির্মাতাদের ‘ফাঁসি’ চায় ইসরায়েল

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

গাজা যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত ‘NAZA’ প্রামাণ্যচিত্রের সহপরিচালক র‍্যাচেল সোর্জের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ করেছেন কয়েক ডজন ডানপন্থী ইসরায়েলি। বিক্ষোভকারীরা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির দাবি করে স্লোগান দেন।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে মধ্য ইসরায়েলের সাভিয়ন এলাকায় সোর্জের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে এ বিক্ষোভ হয়। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ ‘বিশ্বাসঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড’ এবং ‘আইডিএফের নিহতদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’—এ ধরনের স্লোগান দেন।

বিক্ষোভটি ‘NAZA’ চলচ্চিত্রকে ঘিরে ইসরায়েলে চলমান বিতর্কের অংশ। ছবিটির দুই পরিচালক র‍্যাচেল সোর্জ ও ইউভাল আব্রাহাম। চলচ্চিত্রটি গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়ে ২৪ জন ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার বেনামি সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে বলে নির্মাতারা জানিয়েছেন।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার

‘NAZA’ সম্প্রতি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্পেশাল জুরি পুরস্কার পেয়েছে। এরপর থেকেই ইসরায়েলে চলচ্চিত্রটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ছবিতে গাজায় সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত ছিল—তা নিয়ে সাবেক ও বর্তমান ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী চলচ্চিত্রটির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, ছবিতে ব্যবহৃত বেনামি সূত্রগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং চলচ্চিত্রটি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের একটি বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরেছে।

পরিচালকদের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ

চলচ্চিত্রটি নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যও এসেছে।

ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার চলচ্চিত্রটির নির্মাতাদের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তুলেছেন এবং তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বিদেশে ইসরায়েলি সেনাদের ‘মানহানি’কারীদের বিরুদ্ধে নতুন আইন করার কথা বলেছেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে নাগরিকত্ব বাতিলের সুযোগ রাখার কথাও তিনি বলেছেন।

তবে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নাগরিকত্ব বাতিলের ওই উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন।

বিক্ষোভকারীদের হুমকি

‘NAZA’ নির্মাতারা বর্তমানে ইসরায়েলের বাইরে রয়েছেন। বিক্ষোভের অন্যতম সংগঠক মর্দখাই ডেভিড তাদের দেশে ফেরার পর বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ করার এবং তাদের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার কথা বলেছেন। সোর্জের বাবা-মায়ের বাড়ির পাশাপাশি অন্য পরিচালক ইউভাল আব্রাহামের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ করার চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দেশটির ডানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, বিক্ষোভের আয়োজকদের মধ্যে এবং অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ‘জিউইশ পাওয়ার’ দলের সঙ্গে যুক্ত বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় রাতেও বিক্ষোভ

পরদিন বৃহস্পতিবারও সোর্জের বাবা-মায়ের বাড়ির সামনে কয়েক ডজন মানুষ বিক্ষোভ করেন। এ সময় ‘বিশ্বাসঘাতকদের বিতাড়ন’—এমন স্লোগান দেওয়ার কথা জানিয়েছে টাইমস অব ইসরায়েল।

‘NAZA’ নিয়ে বিতর্ক এখন চলচ্চিত্রের বক্তব্যের বাইরেও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় গড়িয়েছে। একদিকে নির্মাতারা তাদের অনুসন্ধান ও সাক্ষ্যকে গাজা যুদ্ধের বাস্তবতা নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনার প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন; অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকার ও সামরিক কর্তৃপক্ষ চলচ্চিত্রটির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার হিসেবে দেখছে।

ফলে ‘NAZA’কে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু একটি চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি, সেনাবাহিনীর জবাবদিহি এবং যুদ্ধকালীন ভিন্নমত প্রকাশের সীমা নিয়েও বিতর্ক তৈরি করেছে।

এমইউ
আরও পড়ুন