একসময় স্পেনের ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও ভ্যালেন্সিয়ার মতো বড় দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করা দেপোর্তিভো লা করুনিয়া যেন আবারও নিজের পুরোনো পরিচয় ফিরে পাচ্ছে। আট বছর পর লা লিগায় প্রত্যাবর্তনের পর গ্যালিসিয়ার ক্লাবটি বড় কিছু করার এম্বিশন নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছে। ফুটবলবিশ্বে তাই ফিরে এসেছে পুরোনো নাম—‘সুপার দেপোর’।
দেপোর্তিভোর প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধু একটি ফুটবল দলের শীর্ষ লিগে ওঠার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পতন, আর্থিক সংকট, তৃতীয় স্তরে নেমে যাওয়া এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ যাত্রা।
১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত দেপোর্তিভো লা করুনিয়া ছিল ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আলোচিত দল। সেই সময়ের দলটিই পরিচিত হয়ে ওঠে ‘সুপার দেপোর’ নামে।
১৯৯৯ সালে তারা প্রথমবারের মতো লা লিগার শিরোপা জেতে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে ক্লাবটি নয়বার স্প্যানিশ লিগের শীর্ষ তিনে জায়গা করে নেয়। চ্যাম্পিয়নস লিগেও তারা নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত। ২০০৪ সালে সেমিফাইনালে পোর্তোর কাছে বাদ পড়ার আগে তারা ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।
সেই সময় দেপোর্তিভোর জার্সিতে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান তারকা বেবেতো, মৌরো সিলভা, জালমিনহা এবং গ্যালিসিয়ান কিংবদন্তি ফ্রানদের মতো খেলোয়াড়। তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবল, সংগঠিত রক্ষণ এবং বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করার ক্ষমতা ক্লাবটির আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিল।
কিন্তু সাফল্যের সেই সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আর্থিক ও সাংগঠনিক সমস্যার সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্সের অবনতিও শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেপোর্তিভো স্পেনের শীর্ষ স্তরের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যায়।
শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে দলটি স্প্যানিশ ফুটবলের তৃতীয় স্তরেও নেমে যায়। যে ক্লাব একসময় চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে খেলেছিল, তাদের জন্য এটি ছিল গভীর সংকটের সময়।
সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কয়েক বছর সময় লাগে। দ্বিতীয় স্তরে ফেরার পর ২০২৪-২৫ মৌসুমে দলটি ১৫তম স্থানে শেষ করেছিল। কিন্তু পরের মৌসুমেই নাটকীয় পরিবর্তন আসে এবং সরাসরি উন্নীত হয়ে লা লিগায় ফিরে আসে। অর্থাৎ মাত্র এক মৌসুমের ব্যবধানে দ্বিতীয় স্তর থেকে স্পেনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসে দেপোর্তিভো।
লা লিগায় ফিরে শুধু টিকে থাকার পরিকল্পনায় থামেনি ক্লাবটি। নতুন মৌসুমে বড় ধরনের দলবদল করেছে তারা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে ১০ জন নতুন খেলোয়াড় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত নাম পিয়ের-এমেরিক অবামেয়াং। ৩৭ বছর বয়সী এই গ্যাবন তারকা লা লিগায় ফিরে দারুণ শুরু করেছেন। মৌসুমের প্রথম চার ম্যাচেই গোল করে ক্লাবের হয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানের জয়ে শেষদিকে তাঁর গোলই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।
তবে অবামেয়াং একমাত্র বড় নাম নন। দেপোর্তিভো দলে এনেছে জোসে মারিয়া হিমেনেজ, মার্ক কাসাদো, আদামা ত্রাওরে, আনহেলিনো ও লোরেঞ্জো আমাতুচির মতো খেলোয়াড়দেরও। ফলে নতুন দলটি অভিজ্ঞতা, তারুণ্য ও শারীরিক সক্ষমতার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে।
দেপোর্তিভোর পরিচয়ের বড় অংশই তার সমর্থক। আট বছর পর লা লিগায় ফেরায় গ্যালিসিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।
ক্লাবটির ঐতিহাসিক মাঠ রিয়াজোর আবারও স্পেনের শীর্ষ ফুটবলের অন্যতম আলোচিত ভেন্যু হয়ে উঠেছে। একসময় এই মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার মতো দলগুলোর জন্য ম্যাচ জেতা কঠিন ছিল। ১৯৯২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রিয়াজোরে লিগে রিয়াল মাদ্রিদের জয়ও অধরা ছিল।
সেই ইতিহাসই এখন নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে আবার ফিরে আসছে।
‘সুপার দেপোর’ নামটি মূলত নব্বইয়ের দশক ও ২০০০-এর শুরুর সেই সোনালি যুগকে বোঝায়। বর্তমান দলটি অবশ্য সেই সময়ের দল নয়। বেবেতো, মৌরো সিলভা কিংবা ফ্রানদের জায়গায় এসেছে নতুন প্রজন্মের ফুটবলার।
তবে ক্লাবটির বর্তমান প্রকল্পে সেই পুরোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছাপ স্পষ্ট। বড় নামের খেলোয়াড় আনা, তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞদের মিশ্রণ এবং লা লিগায় ফিরে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ‘সুপার দেপোর ২.০’ ধারণা।
ক্লাবটির মালিকানা ও বিনিয়োগ কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। গ্যালিসিয়ান ব্যাংক আবানকা ক্লাবটির পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন ব্যবস্থাপনায় দেপোর্তিভো আবারও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
দেপোর্তিভোর জন্য লা লিগায় ফেরা নিছক একটি পদোন্নতি নয়। এটি সেই ক্লাবের পুনর্জন্ম, যে ক্লাব একসময় স্পেনের ফুটবল মানচিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল, পরে তৃতীয় স্তরে নেমে গিয়ে অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়েছিল।
আট বছর পর শীর্ষ লিগে ফিরে তারা এখন নতুন পরিচয় তৈরি করতে চাইছে। অতীতের সাফল্য তাদের অনুপ্রেরণা, কিন্তু বর্তমান দলের সামনে বাস্তবতা ভিন্ন। লা লিগায় বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদসহ শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ মৌসুমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
তবু শুরুতেই অবামেয়াংয়ের গোল, নতুন খেলোয়াড়দের আগমন এবং রিয়াজোরের গ্যালারিতে ফিরে আসা উচ্ছ্বাস একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—দেপোর্তিভো লা করুনিয়া আবারও স্পেনের শীর্ষ ফুটবলের গল্পের অংশ।
ঝটিকা মিছিল এখন পুলিশের জন্য 'আতঙ্ক'
ইরানকে ‘নির্মূল’ করবো নাকি করবো না সিদ্ধান্ত আসছে: ট্রাম্প
প্রামাণ্যচিত্র নাজা'র নির্মাতাদের ‘ফাঁসি’ চায় ইসরায়েল