জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রটোকল দলের ছয় কর্মকর্তার থাকার কথা জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা ফার্স।
ফার্সের মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ানের সফরসঙ্গীদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা রয়েছেন। তালিকায় আছেন প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ মোহসেন হাজি-মিরজায়ি, প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের প্রটোকল ও অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা সাইয়েদ মোহাম্মাদ মুসাভি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদেশি গণমাধ্যমবিষয়ক মহাপরিচালক আলিরেজা মিরইউসেফি।
এর আগে ইরানি প্রেসিডেন্টের জনসংযোগ বিভাগের মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ আব্বাসি জানিয়েছিলেন, পেজেশকিয়ানের সঙ্গে চিফ অব স্টাফ মোহসেন হাজি-মিরজায়ি এবং প্রেসিডেন্টের প্রটোকল বিভাগের উপপ্রধান সাইয়েদ আব্বাস মুসাভি থাকবেন।
যুদ্ধের মধ্যেই নিউইয়র্ক সফর
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই পেজেশকিয়ান নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন। ওয়াশিংটন এর আগে পেজেশকিয়ান, আরাগচি এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মীদের নিয়ে একটি সীমিত ইরানি প্রতিনিধিদলকে নিউইয়র্কে আসার ভিসা দেওয়ার অনুমোদন দেয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, জাতিসংঘের আয়োজনে স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ইরানের মূল প্রতিনিধিদলকে অধিবেশনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের চলাচল ও কিছু পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে এবং এবারের প্রতিনিধিদল গত বছরের তুলনায় ছোট হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিনি অধিবেশনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ইরানি কর্মকর্তাদের কেনাকাটায় মার্কিন বিধিনিষেধ
পেজেশকিয়ানের সফরের আগে ওয়াশিংটন ইরানি কর্মকর্তাদের নিউইয়র্ক অবস্থান নিয়ে বেশ কিছু বিধিনিষেধ ঘোষণা করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিতে আসা ইরানি কর্মকর্তারা বিলাসবহুল পণ্য কেনা এবং পাইকারি সদস্যপদভিত্তিক দোকানে কেনাকাটা করতে পারবেন না। এসব বিধিনিষেধ গত বছরও ইরানি কর্মকর্তাদের ওপর আরোপ করা হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানি প্রতিনিধিদলের নিউইয়র্কে চলাচলও নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিনিধিদলের চলাচল জাতিসংঘ সদর দপ্তর, ইরানের জাতিসংঘ মিশন, রাষ্ট্রদূতের বাসভবন এবং জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক থাকবে।
পেজেশকিয়ানের মিডিয়া দলের ভিসা নিয়ে বিতর্ক
এবারের সফরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানি প্রেসিডেন্টের মিডিয়া দলের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না পাওয়া।
ইরানের প্রেসিডেন্টের জনসংযোগ বিভাগের মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ আব্বাসি ২১ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, পেজেশকিয়ানের সঙ্গে থাকা মিডিয়া টিমের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের নিউইয়র্ক সফর পাঁচ দিনের, যার মধ্যে দুই দিন যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত।
ফলে পেজেশকিয়ানের সফর এবং নিউইয়র্কে তাঁর বৈঠকগুলোর খবর ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সরকারি যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিডিয়া দলের ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে তখন কোনো বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
সফরের কূটনৈতিক গুরুত্ব
পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টাও চলছে। হরমুজ প্রণালি, যুদ্ধ বন্ধের শর্ত এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী গারিবাবাদি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাইয়ের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘের অধিবেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে ইরানের যুদ্ধ, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সফরটি কেবল আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয় নয়; ইরানের অভ্যন্তরেও এটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। ফলে নিউইয়র্কে পেজেশকিয়ানের প্রতিটি বৈঠক এবং বক্তব্য একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকে অগ্রগতি নেই
জাতিসংঘে ভাষণে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি ট্রাম্পের
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ মেনে নেওয়া হবে না