যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় অংশ নিয়ে অভিশংসনের মুখে আরাগচি

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়ার ঘটনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন দেশটির কয়েকজন সংসদ সদস্য।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য আলী খেজরিয়ান বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আরাগচির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না এবং তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নির্ধারিত নীতিমালার কাঠামোর বাইরে হয়েছে।

খেজরিয়ান বলেন, “সংসদ সদস্যরা আরাগচির অভিশংসনের প্রস্তাব নিবন্ধন করেছেন এবং বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, নিউইয়র্ক সফর শেষে দেশে ফেরার পর আরাগচিকে পার্লামেন্টে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে—কোন কর্তৃত্বের ভিত্তিতে তিনি মার্কিন পক্ষের সঙ্গে ওই আলোচনা করেছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আরাগচির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের যোগাযোগ হয়। মার্কিন পক্ষ থেকে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনাটিকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করলেও ইরানের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে, তেহরানের মূল শর্তগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ বা আটকে থাকা সম্পদ ছাড় এবং যুদ্ধের অবসান। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নিউইয়র্কের এই যোগাযোগকে কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরাগচির বিরুদ্ধে সংসদীয় উদ্যোগের পেছনে মূল প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা করার অনুমোদন তাঁর ছিল কি না।

ইরানের কট্টরপন্থী মহলের কয়েকজন এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাঠামোর অনুমোদন ছাড়া আরাগচি কীভাবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। ইরানের আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজও অভিযোগ করেছে, অনুমোদিত পরিকল্পনা ছিল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া; এর বাইরে সরাসরি যোগাযোগকে তারা সমালোচনা করেছে।

রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাগচি ও উইটকফের বৈঠকের খবর প্রকাশের পর ইরানের কট্টরপন্থী মহলে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা জোরালো হয় এবং কেউ কেউ অভিশংসনের দাবিও তোলেন।

তবে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবাই যে কূটনৈতিক যোগাযোগের বিরোধিতা করছেন, তা নয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, বিরোধটি মূলত আলোচনা হবে কি না—তার চেয়ে আলোচনা কীভাবে, কোন সীমার মধ্যে এবং কার অনুমোদনে হবে—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে সামরিক চাপের বিরোধিতা করলেও কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করার কথা বলেননি। একই সময়ে মার্কিন পক্ষও জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। তেহরান জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধ কমানো হলে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত। একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন চাপ ও অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খোলার সুযোগ থাকতে পারে।

তবে সর্বশেষ আলোচনার পরও দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।

নিউইয়র্ক সফর শেষে দেশে ফেরার পর আরাগচিকে সংসদে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হতে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া বাস্তবে কতদূর এগোয়, সেটি নির্ভর করবে পার্লামেন্টের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর বিভিন্ন অংশের অবস্থানের ওপর।

তবে ঘটনাটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তেহরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার কতটা কর্তৃত্ব রয়েছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ সংকট নিয়ে যোগাযোগের পথ খোলা রাখছে; অন্যদিকে তেহরানের অভ্যন্তরে সেই আলোচনার সীমা ও অনুমোদন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। ফলে নিউইয়র্কে শুরু হওয়া কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের পারস্পরিক অবস্থানের ওপর নয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের ওপরও নির্ভর করছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত