ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখে: জাতিসংঘে আব্বাস

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ এএম

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের নীতিগুলো এখন আর শুধু দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না; বরং তা ফিলিস্তিনিদের ‘জীবন ও অস্তিত্বের’ জন্যও হুমকি তৈরি করেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আব্বাসের পূর্বধারণকৃত ভিডিও বক্তব্য সম্প্রচার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ভিসা না দেওয়ায় রামাল্লা থেকে তাঁর বক্তব্য সম্প্রচার করা হয়। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলকে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আব্বাস বলেন, ফিলিস্তিনিরা তাদের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলোর’ একটি পার করছে। তাঁর ভাষায়, হত্যা, ধ্বংস, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতির চেষ্টা এবং যুদ্ধের কারণে গাজায় নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।

গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ফিলিস্তিনিদের জীবন ও ভবিষ্যতের ভিত্তিগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, গাজার বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, শহর, শরণার্থীশিবির, প্রতিষ্ঠান, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মসজিদ ও গির্জা ধ্বংস হয়েছে।

আব্বাসের বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট। তিনি সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে একটি ‘ঔপনিবেশিক পরিকল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে প্রতিদিনই ‘মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা’ পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এসব বসতি অবৈধ—এমন অবস্থান জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও চলতি অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে পশ্চিম তীরে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত ভূখণ্ড রক্ষা এবং সেখানে বসবাসকারী জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়েই এই সমাধানকে বাঁচিয়ে রাখার কাজ শুরু করতে হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরকে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অধীনে একীভূত করার দিকে যেতে হবে। সেখানে একটি বৈধ ও একক সশস্ত্র বাহিনী থাকার কথাও বলেন তিনি।

২০ বছর পর নির্বাচনের পরিকল্পনা

জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ও তুলে ধরেন আব্বাস। তিনি জানান, আগামী ২৮ নভেম্বর আইনসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২০ বছর পর ফিলিস্তিনে আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

ফিলিস্তিনিদের সর্বশেষ আইনসভা নির্বাচন হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেই নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর ফাতাহর সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয় এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

আগামী নির্বাচন নিয়ে অবশ্য বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর আগে আগস্টে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সম্ভাব্য জোট নিয়েও আলোচনা চলছে। আব্বাস জুলাইয়ে ২৮ নভেম্বর আইনসভা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিলেন।

আব্বাস বলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জাতীয় সংস্কার কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে, যার প্রতিশ্রুতি তারা জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দিয়েছিল।

আব্বাসের বক্তব্যের দিনই হামাস জানায়, গাজা যুদ্ধের অবসান এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর রোডম্যাপ বাস্তবায়নে তারা প্রস্তুত।

হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম এক বিবৃতিতে বলেন, গাজা নিয়ে বোর্ড অব পিসের সঙ্গে সম্মত রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য তাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত ১৫ দফা রোডম্যাপে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ, গাজার প্রশাসন একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর এবং ধাপে ধাপে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে হামাসের অভিযোগ, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও গাজা-সংক্রান্ত রোডম্যাপের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে না এবং একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বাড়াচ্ছে।

হামাস আরও দাবি করেছে, বোর্ড অব পিস এবং গাজার জন্য তাদের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ ইসরায়েলকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে ইসরায়েলি পক্ষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি।

দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

আব্বাসের বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজা ও পশ্চিম তীর—দুই ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের কার্যালয়ও বলেছে, গাজা ও পশ্চিম তীরকে একটি একক ভূখণ্ড হিসেবে রেখে একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি সরকারের অধীনে পুনর্গঠন এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

তবে বাস্তবে গাজার যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার প্রশাসন এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ—প্রতিটি বিষয়ই জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রশ্ন তৈরি করছে।

ফলে আব্বাসের জাতিসংঘ ভাষণে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান থাকলেও, সেই সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিবেশ কতটা দ্রুত তৈরি হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। একই সময়ে ফিলিস্তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে আলোচনাও পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের আলোচনায় তাই ফিলিস্তিন প্রশ্ন আবারও উঠে এসেছে দুটি পরস্পর সম্পর্কিত বিষয়ে—গাজা যুদ্ধের অবসান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ। আব্বাসের ভাষণে মূল বার্তা ছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও জনগণকে রক্ষা না করে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত