ইরান বর্তমানে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তবে যুদ্ধের মধ্যেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, শক্ত অবস্থান থেকে ইরানের জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) তেহরানে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন পেজেশকিয়ান। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) এ তথ্য জানিয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান একদিকে সামরিক চাপ মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা।
যুদ্ধের মধ্যেও আলোচনা অব্যাহত
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশ যুদ্ধের মধ্যে থাকলেও আলোচনা বন্ধ করবে না। তবে সেই আলোচনা হবে ইরানের শক্ত অবস্থান থেকে এবং দেশের জনগণের অধিকার ও স্বার্থকে সামনে রেখে।
তিনি একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বহুপাক্ষিক যোগাযোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, ইরান তার প্রয়োজনের কিছু অংশ পূরণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে।
তবে বিদেশি সহযোগিতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতাকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে রাখার কথা বলেন তিনি।
উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখার নির্দেশ
মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেজেশকিয়ান শিল্প ও উৎপাদন খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশংসা করেন। তাঁর দাবি, শিল্প, তেল, জ্বালানি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের জটিল স্থাপনাগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধারে এসব কর্মীর ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ বা সংকটের মধ্যেও উৎপাদনব্যবস্থা থেমে যেতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তা দেশের অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের সব মন্ত্রী ও কর্মকর্তাকে মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
অর্থনীতি সামলাতে সরকারি সংস্থাগুলোকে গুরুত্ব
পেজেশকিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা ও বাজেট সংস্থার পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, জ্বালানি ও তেল মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমান চাপ মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে কাজ করছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল ও জ্বালানি খাত ইরানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটির অর্থনীতি ও বৈদেশিক আয়ের বড় অংশই জ্বালানি খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে অবকাঠামো রক্ষা এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখা তেহরানের জন্য একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বার্তা
ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান তার প্রয়োজন মেটাতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধকালীন সরবরাহব্যবস্থা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সচল রাখার চেষ্টা করছে তেহরান।
তবে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন, বিদেশি সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইরানের মূল কৌশল হবে নিজস্ব সক্ষমতা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর নির্ভর করা।
‘জাতীয় সংহতি’কে সামনে রাখছে তেহরান
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে জাতীয় সংহতি ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, সামরিক সংঘাতের সময় একটি দেশের জন্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে অর্থনীতি, উৎপাদন, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও নাগরিক জীবনের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হয়।
এই কারণেই উৎপাদন খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন না ঘটানোর ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
আলোচনার দরজা খোলা রাখার ইঙ্গিত
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে একই সঙ্গে প্রতিরোধ এবং আলোচনার দুটি বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে তিনি ইরানকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের’ মধ্যে থাকা দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন।
এতে বোঝা যায়, তেহরান সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও খোলা রাখতে চাইছে। তবে আলোচনার ক্ষেত্রে ইরানের অধিকার ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, তেহরান দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনা করতে আগ্রহী নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—একদিকে সামরিক সংঘাত মোকাবিলা করা, অন্যদিকে অর্থনীতি ও জনগণের দৈনন্দিন জীবন সচল রাখা। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে সেই দ্বৈত কৌশলই স্পষ্ট হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের বার্তা হলো, যুদ্ধ চললেও উৎপাদন থামবে না, অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে জাতীয় সক্ষমতা ও সংহতিকেই সংকট মোকাবিলার প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরে রাখবে তেহরান।
এসসিওর সন্ত্রাসবিরোধী মহড়ায় নিরাপত্তা সমন্বয়ই প্রধান লক্ষ্য: আইআরজিসি
গাজার যুদ্ধ কিভাবে ব্রিটেনজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকে বিস্তৃত করেছে
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার বিকল্প খুঁজছেন ট্রাম্প