মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে ধূলিকণা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে জাপান থেকে একটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। অভিযানটি সফল হলে মঙ্গলগ্রহ বা এর কোনো উপগ্রহ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা প্রথমবারের মতো পৃথিবীতে এনে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জেএএক্সএর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ‘মার্স মুনস এক্সপ্লোরেশন’ (এমএমএক্স) অভিযান। মহাকাশযানটির ২০২৭ সালের আগস্টে ফোবোসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই অভিযান মঙ্গলের দুই উপগ্রহ ফোবোস ও ডেইমোস কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই দীর্ঘদিনের রহস্যের সমাধান দিতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক সারা রাসেল এই অভিযানে নমুনা বিশ্লেষণ কার্যক্রমের উপপ্রধান হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এর আগে কোনো অভিযান সফলভাবে ফোবোসে গিয়ে সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও রোমাঞ্চকর একটি অভিযান।
সৌরজগতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে পৃথিবী ও মঙ্গল—এই দুই গ্রহের মোট তিনটি প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে। পৃথিবীর চাঁদের পাশাপাশি মঙ্গলের উপগ্রহ দুটি হলো ফোবোস ও ডেইমোস। এগুলো আকারে খুবই ছোট এবং দেখতে অনেকটা অনিয়মিত আকৃতির আলুর মতো। ফোবোসের ব্যাস প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং ডেইমোসের ব্যাস প্রায় ১০ কিলোমিটার।
মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর এমএমএক্স মহাকাশযানটি প্রথমে ডেইমোস পর্যবেক্ষণ করবে। এরপর এর প্রধান লক্ষ্য হবে ফোবোস। সেখানে একটি ছোট রোভার বা অনুসন্ধানযান নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফোবোসে রোভার নামানো কেন কঠিন?
ফোবোসের পৃষ্ঠে রোভার নামানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, উপগ্রহটির নিজস্ব মহাকর্ষ বল খুবই দুর্বল। অন্যদিকে এর কাছেই রয়েছে বিশাল মঙ্গলগ্রহ, যার মহাকর্ষ বল অনেক বেশি। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ফোবোসের পৃষ্ঠে নিরাপদে রোভার অবতরণ করানো জটিল হয়ে উঠবে।
অধ্যাপক সারা রাসেল জানান, এত ছোট কোনো উপগ্রহে এর আগে কখনো রোভার অবতরণ করানো হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোভারটি প্রথমে ফোবোসের পৃষ্ঠ ঘুরে নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করবে। এরপর মূল মহাকাশযানটি সেখানে অবতরণ করার চেষ্টা করবে।
ফোবোসের পৃষ্ঠে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটি একটি রোবোটিক বাহু এবং দুটি নমুনা সংগ্রাহক যন্ত্র ব্যবহার করে ধূলিকণা সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত উপাদান একটি ছোট ক্যাপসুলে রাখা হবে। পরে সেটি পৃথিবীতে ফিরে আসবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালে ক্যাপসুলটি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের উমেরা মরুভূমিতে অবতরণ করবে। পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার জন্য নমুনার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ গ্রাম।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লেস্টারের গবেষক ডা. ক্রাইসা আভদেলিদু এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, নমুনার পরিমাণ খুব কম হলেও এর প্রতিটি কণা থেকে একাধিক ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো সম্ভব। গবেষণার জন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহ থেকে কয়েক কেজি উপাদান নিয়ে আসা জরুরি নয়। অল্প পরিমাণ নমুনাও অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।
মঙ্গলের উপগ্রহ কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
ফোবোস ও ডেইমোসের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রধানত দুটি ধারণা রয়েছে।
প্রথম ধারণা অনুযায়ী, মঙ্গলের ইতিহাসের শুরুর দিকে একটি মহাজাগতিক বস্তু গ্রহটির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। সেই সংঘর্ষে ছিটকে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকে পরবর্তী সময়ে ফোবোস ও ডেইমোস তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় ধারণাটি হলো, উপগ্রহ দুটি আসলে সৌরজগতের বাইরের দিক থেকে আসা গ্রহাণু। মঙ্গলের মহাকর্ষ বল সেগুলোকে নিজের কক্ষপথে আটকে ফেলেছিল।
ফোবোস থেকে আনা নমুনার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও খনিজ উপাদান বিশ্লেষণ করে এই দুই ধারণার মধ্যে কোনটি বেশি গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
অধ্যাপক সারা রাসেলের মতে, দুটি ধারণার ক্ষেত্রে নমুনার রাসায়নিক গঠন ও খনিজ উপাদানে স্পষ্ট পার্থক্য থাকার কথা। তাই নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছালে সেটি সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয়েছিল, নাকি মঙ্গলের মহাকর্ষে আটকে পড়া কোনো গ্রহাণু—তা তুলনামূলক দ্রুত বোঝা যেতে পারে।
নমুনায় মিলতে পারে মঙ্গলেরও উপাদান
এই অভিযানের আরেকটি সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। ফোবোস মঙ্গলের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় গ্রহটির পৃষ্ঠে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর আঘাত লাগলে সেখান থেকে ছিটকে যাওয়া ক্ষুদ্র কণা ফোবোসের গায়ে জমা হতে পারে।
অধ্যাপক রাসেলের মতে, এমনটা হলে ফোবোস থেকে সংগ্রহ করা নমুনার মধ্যে মঙ্গলগ্রহেরও কিছু কণা পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একই অভিযানের মাধ্যমে মঙ্গলের গঠন ও ইতিহাস সম্পর্কেও সরাসরি তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মঙ্গলগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা মহাকাশবিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার ২০২১ সাল থেকে মঙ্গলে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। রোভারটি গ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে বিশেষ কনটেইনারে সংরক্ষণ করছে।
এসব নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার জন্য নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার যৌথ ‘মার্স স্যাম্পল রিটার্ন’ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে মার্কিন কংগ্রেসের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রকল্পটি কার্যত বাতিল হয়ে গেছে।
এদিকে চীনও মঙ্গলগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহের নিজস্ব অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে নেওয়া ওই অভিযানের মাধ্যমে ২০৩১ সালে মঙ্গলের উপাদান পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
পৃথিবীতে মঙ্গলের পাথর থাকলেও সরাসরি নমুনা আলাদা
পৃথিবীতে ইতিমধ্যে মঙ্গলগ্রহের কিছু পাথরের টুকরা পাওয়া গেছে। এগুলোকে বলা হয় মঙ্গলীয় উল্কাপিণ্ড। ধারণা করা হয়, মঙ্গলের পৃষ্ঠে গ্রহাণুর আঘাতে ছিটকে যাওয়া পাথরের টুকরা মহাকাশ পেরিয়ে পৃথিবীতে এসে পড়েছে।
তবে এসব উল্কাপিণ্ড অত্যন্ত বিরল। পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর বায়ু, ধুলা, মাটি ও পানির সংস্পর্শে এসে এগুলোর মূল রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা দূষিত হতে পারে।
এ কারণেই বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহ বা এর উপগ্রহ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা নমুনা পৃথিবীতে আনার বিষয়ে এত আগ্রহী। মহাকাশ থেকে বিশেষভাবে সংগ্রহ করে সুরক্ষিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা নমুনা তুলনামূলকভাবে দূষণমুক্ত থাকবে। ফলে মঙ্গল ও এর উপগ্রহের প্রকৃত গঠন, উৎপত্তি এবং ইতিহাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
হোয়াইট হাউসে চলছে ‘অস্থিরতা’
ভারতীয় এক কিশোরের চোখের উপরে দাঁত!
'অমর জেলিফিশ' কী বদলে দেবে চিকিৎসাবিজ্ঞান?