এটি যেন পাশাপাশি মঞ্চে চলতে থাকা দুটি নাটক, যার একমাত্র দর্শক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধে চলমান শান্তি প্রক্রিয়া এক অস্বাভাবিক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। একদিকে ইউরোপীয় মিত্র ও ইউক্রেন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ও হুমকিকে এমন একটি পরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে পারে। অন্যদিকে ক্রেমলিনও নিজস্ব কৌশলে এগোচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ এমন সব ব্যবসায়িক সুযোগ তুলে ধরছেন, যা ব্যবসাবান্ধব মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আকৃষ্ট করতে পারে, ওয়াশিংটনকে মস্কোর আরও কাছে টানতে পারে এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার ধীরগতির সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।
ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করছেন। কিন্তু দুই পক্ষের কৌশল ও লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী। ফলে শান্তি আলোচনার এই দুই ধারার মধ্যে সমন্বয় নেই, অচলাবস্থা কাটারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প যখন রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার কথা বলেন, তখন একটি বিষয় অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়—মস্কোর কাছে শান্তির অর্থ মূলত বিজয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দাবিগুলোও স্পষ্ট। সবচেয়ে কম উচ্চাভিলাষী অবস্থানেও তিনি চান, ইউক্রেন যেন আর যুদ্ধ না করেই পুরো দোনেৎস্ক অঞ্চল ছেড়ে দেয়। এর বাইরে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস, ন্যাটোতে যোগ না দেওয়ার অঙ্গীকার এবং কিয়েভের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে পুতিনের বিবেচনায় রয়েছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এসব দাবি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসম্ভব। তাই রাশিয়ার নেতৃত্ব আপাতত দোনেৎস্ক দখলকে আলোচনার মাধ্যমে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে সামনে রেখেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের ওপর ওই অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার চাপও বাড়ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কেন সহজেই দোনেৎস্ক ছেড়ে দিচ্ছেন না? অঞ্চলটির অবশিষ্ট অংশে বসবাসের পরিবেশ প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। রাশিয়ার ড্রোনগুলো দিনরাত ক্রামাতোরস্ক শহরে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোনেৎস্কের বৃহত্তম জনবসতিপূর্ণ এই শহরটি এখন নিয়মিত হামলার হুমকিতে রয়েছে। স্লোভিয়ানস্ক, দোব্রোপিলিয়া ও কস্তিয়ানতিনিভকার মতো শহরগুলো হয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, নয়তো রাশিয়ার গ্লাইড বোমার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। সামরিক দিক থেকে শহরগুলোর গুরুত্ব অনেক হলেও সেখানে বেসামরিক জীবন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
তবে দোনেৎস্ক কেন ইউক্রেনের ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়, তার সবচেয়ে জোরালো ব্যাখ্যা এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি মার্কো রুবিওর কাছ থেকেই। ব্রেইটবার্ট নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, রাশিয়া দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রায় ৮৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউক্রেনের হাতে থাকা অবশিষ্ট অংশকে দেশটি নিজেদের ‘প্রতিরক্ষাব্যূহ’ হিসেবে বিবেচনা করে। রুবিওর ভাষায়, ‘তাদের যুক্তি হলো, এটিই প্রতিরক্ষার জন্য শেষ উপযোগী রেখা। সামরিক কৌশলবিদেরাও বলছেন, কথাটি সত্য। এখান থেকে কিয়েভের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রায় সরাসরি।’
রুবিও আরও বলেন, রাশিয়া প্রকৃতপক্ষে খুব একটা অগ্রসর হতে পারছে না। এ কারণে তারা ইউক্রেনের মানুষের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে এবং দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা করছে। পাল্টা জবাবে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। উইটকফ ও কুশনারের শান্তি প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দিলেও রুবিও শেষ পর্যন্ত বলেন, ‘আমরা চাই যুদ্ধের অবসান হোক। তবে একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও আমাদের অগ্রাধিকার রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জেলেনস্কির সঙ্গে ৪৫ মিনিট ফোনে কথা বলেছেন রুবিও। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তার শেষ বক্তব্যে যতটা অনাগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে, বাস্তবে যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে তিনি হয়তো তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবু তার প্রত্যাশা কমিয়ে আনার বিষয়টি শান্তি আলোচনার দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের বাস্তবতাই তুলে ধরে। ইউক্রেন চায় টিকে থাকতে, আর রাশিয়া চায় জয়ী হতে—এবং মস্কো এখনো মনে করে, সেই জয় অর্জন সম্ভব।
হোয়াইট হাউসের অন্যতম বিচক্ষণ ব্যক্তিদের একজনও যদি শান্তি প্রতিষ্ঠাকে অত্যন্ত কঠিন সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন, তাহলে গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে টানাপোড়েনের ফল কী? ট্রাম্প যে সমঝোতার কথা বলে আসছেন, তার পদক্ষেপগুলো কি সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে গেছে? রাশিয়াকে শান্তির পথে আনতে ট্রাম্প একের পর এক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু সেই শান্তির শর্ত কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট করেননি তিনি। ফলে তার পদক্ষেপগুলোকে অনেকটা উদ্দেশ্যহীন চাপ সৃষ্টি হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যার তাৎক্ষণিক সুবিধা পাচ্ছে পুতিনের সরকার।
মস্কোকে দেওয়া ট্রাম্পের সুবিধার তালিকাও দীর্ঘ। হঠাৎ করে রাশিয়ার ডিজেল কেনার বিষয়ে একটি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পুতিনের যুদ্ধ তহবিলে শত শত কোটি ডলার যোগ করতে পারে। পাশাপাশি ট্রাম্প একতরফাভাবে জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি সম্পর্কে রাশিয়া বা ইউক্রেন—কোনো পক্ষই অবগত ছিল কি-না, তা স্পষ্ট নয়। ওই ঘোষণার ফলে কয়েক দিনের জন্য রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা কমে যায়।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্টারলিংক প্রযুক্তির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধতার কারণে অন্তত কয়েক রাত ইউক্রেন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা পায়নি। একই সঙ্গে জেলেনস্কিকে বারবার ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউক্রেনের জন্য মার্কিন আর্থিক সহায়তা কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ হয়ে থাকা। ফলে দেশটির সামরিক সহায়তার ব্যয় এখন ইউরোপকে বহন করতে হচ্ছে। পুতিন যদি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করতেন, তাহলে পরিস্থিতি সম্ভবত এমনই হতো।
নরওয়ের অসলোতে সরাসরি উইটকফের সঙ্গে বৈঠক এবং ভার্চুয়ালি কুশনারের সঙ্গে আলোচনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও স্টারলিংক নিয়ে রুবিওর কাছ থেকে শিগগিরই ইতিবাচক খবর পাওয়ার আশা করছেন তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ‘এখন কার্যকরভাবে চলছে’ বলেও সন্তোষ প্রকাশ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা উইটকফের। তবে পুতিনের কাছে তিনি ঠিক কী প্রস্তাব তুলে ধরবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এই মুহূর্তে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ কী?
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিকদেরও ক্ষতির মুখে ফেলছে। তাদের কেউ কেউ রাশিয়াপন্থী এসব নীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক অস্বীকার করার বা দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করছেন। এসব পদক্ষেপের অনেকগুলোই যে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় কিংবা বাস্তবায়ন করা কঠিন, সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ডিজেল আমদানির চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রে পাম্পে জ্বালানির দাম দ্রুত কমাতে পারবে না। ইউরোপের বিধিনিষেধের কারণে ওই উদ্যোগ থেকে পুতিনের সরকার কতটা অর্থ পাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ছিল স্বল্পস্থায়ী ও অযৌক্তিক। এটি ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
স্টারলিংক, মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সামরিক পর্যায়ের যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ড এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ওপর বিধিনিষেধ কখনো কার্যকর হচ্ছে, কখনো আবার শিথিল করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এতে ইউক্রেনীয় সেনারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন। অন্যদিকে রুবিও ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করছেন, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিই অস্বীকার করেছেন। বিভ্রান্তিকর এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখতে হবে। মনে হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের বিশ্বপরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জেলেনস্কি এখন আর ট্রাম্পকে খুশি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশলে আস্থা রাখছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের মন জুগিয়ে চললে সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা থেকে তিনি সরে এসেছেন। মার্কিন সহায়তা হারানোর সম্ভাবনা মেনে নিয়ে এককভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও নিচ্ছে ইউক্রেন। দেশটির উপলব্ধি, খামখেয়ালি আচরণ করা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের ওপর নির্ভর করার চেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপও বুঝতে পারছে, ট্রাম্পের হাতে ক্ষতি করার মতো সময় আর খুব বেশি নেই। তার পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি যা-ই হোক, তা বর্তমান অবস্থার চেয়ে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি একই নীতি অব্যাহত থাকলেও অন্তত ইউরোপ ও ইউক্রেন নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আরও সময় পাবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ট্রাম্পের পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এবং এর পেছনের চিন্তাভাবনা। তিনি কার্যত নিজের দল ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ক্ষতি করছেন। কিন্তু এখনো প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে জোরালো প্রতিযোগিতাও এখনো শুরু হয়নি। সম্ভবত ট্রাম্প মনে করছেন, নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার এটাই তার শেষ বড় সুযোগ। আর সেই সুযোগে তিনি এমন একজন নেতার প্রতি নিজের সমর্থন বাস্তবে প্রকাশ করতে চাইছেন, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে অস্বাভাবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হন। সেই নেতা হলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
সূত্র: সিএনএন
ইয়েমেনে ৪৮ ঘণ্টায় হুথিদের ১০৯ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, নিহত ৮
বিমানবন্দরে ৩ ঘণ্টা আটকে রেখে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীকে জরিমানা
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িত দেশগুলোকেও চড়া মূল্য দিতে হবে: তেহরানের হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মদিনের উপহারের বন্দুক দিয়ে স্কুলে ৪ জনকে হত্যা
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জাপানের বাণিজ্য ঘাটতি ২.৮১ ট্রিলিয়ন ইয়েন
‘চরমপন্থি ইসলামের আগ্রাসনের’ শিকার ফ্রান্স: নেতানিয়াহু
দুই হাজার বছর আগের এক ব্যক্তির মুখাবয়ব উন্মোচন