যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি টাকা ঢালছেন কারা?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে পরিণত হতে পারে। বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুধু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেই ব্যয় হতে পারে ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ আগের যেকোনো নির্বাচনী চক্রের তুলনায় এই ব্যয় বেশি হবে।

নির্বাচনী প্রচারে ব্যয় হওয়া অর্থের বড় অংশ আসছে ধনকুবের, রাজনৈতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এসব অর্থের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয়ের আগে তা একাধিক সংগঠনের হাত ঘুরে যায়, ফলে অর্থের মূল উৎস শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের (এফইসি) তথ্য ব্যবহার করে আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের অনুদানদাতা ধনকুবের, অর্থলগ্নিকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের প্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।

শীর্ষ ৫০ দাতার অনুদান ২৭৭ কোটি ডলার

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ৫০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭৭ কোটি ডলারে।

এর মধ্যে রিপাবলিকানপন্থি দাতাদের অনুদান ১৬৭ কোটি ডলার, যা মোট অনুদানের প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটপন্থি দাতারা দিয়েছেন ৮৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা মোট অর্থের প্রায় ৩০ শতাংশ।

বাকি ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার এসেছে দ্বিদলীয় বা বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ দাতাদের কাছ থেকে। এদের মধ্যে খেলাধুলায় বাজি ধরার ব্যবসা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের পক্ষে কাজ করা সংগঠনও রয়েছে।

২০২৫–২৬ নির্বাচনী চক্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ফেডারেল প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার তহবিলে একজন ব্যক্তি প্রতি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ ডলার অনুদান দিতে পারেন। কিন্তু তালিকায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তি শত শত কোটি নয়, শত শত মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অনুদান দিয়েছেন।

এর কারণ, তাঁদের অর্থের বেশির ভাগ সরাসরি প্রার্থীদের প্রচার তহবিলে যায়নি। বরং তা গেছে সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার পিএসি নামের সংগঠনগুলোতে। এসব সংগঠন অনুদানের কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা ছাড়াই অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।

সুপার পিএসি কী?

সুপার পিএসি হলো এমন রাজনৈতিক সংগঠন, যেগুলো প্রার্থীদের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করতে পারে। সাধারণত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। তবে প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী প্রচার দলের সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ ব্যয় করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ।

২০১০ সালে আদালতের দুটি রায়ের পর এ ধরনের সংগঠনের উত্থান ঘটে। ওই রায়গুলো প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার থেকে স্বাধীন সংগঠনগুলোর নির্বাচনে সীমাহীন অর্থ ব্যয়ের পথ তৈরি করে দেয়।

সুপার পিএসিগুলোকে তাদের দাতাদের নাম ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের কাছে প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু ওয়ান নেশন ও মেজরিটি ফরোয়ার্ডের মতো কিছু বড় অর্থদাতা নিজেরাই অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজেদের অর্থের উৎস প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা নেই।

ফলে রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহৃত অর্থের প্রকৃত উৎস আড়ালে থেকে যেতে পারে। এ ধরনের অর্থায়নকে বলা হয় ‘ডার্ক মানি’ বা অস্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন।

হার্ভার্ড ল স্কুলের আইন ও নেতৃত্ববিষয়ক অধ্যাপক এবং নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কারের প্রবক্তা লরেন্স লেসিগের মতে, এই অর্থের উৎস রাজনীতিকদের কাছে গোপন নয়; বরং ভোটারদের কাছেই তা অস্পষ্ট থেকে যায়।

আলজাজিরার ‘লেটস ফোকাস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাজনীতিকদের কাছে অর্থ কোথা থেকে আসছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি নেই। তাঁরা জানেন, তাঁদের কী করতে হবে।

সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত অনুদানদাতা কারা?

ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ধনী এবং টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত অনুদানদাতা। তিনি দিয়েছেন ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

রিপাবলিকানপন্থি দাতাদের তালিকায় এরপর রয়েছেন জাহাজীকরণ সামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউলাইনের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউলিন। তাঁরা দিয়েছেন ১৫ কোটি ডলার। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান সুসকেহানা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ ইয়াস ও তাঁর স্ত্রী জ্যানিন ইয়াস দিয়েছেন ১১ কোটি ডলার। এই তিন দাতা রিপাবলিকানপন্থি সংগঠনগুলোকে অর্থ দিয়েছেন।

রিপাবলিকানপন্থি শীর্ষ ব্যক্তিগত দাতারা হলেন—

  • ইলন মাস্ক: ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার
  • এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউলিন: ১৫ কোটি ডলার
  • জেফ ও জ্যানিন ইয়াস: ১১ কোটি ডলার

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটপন্থি দাতাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন ধনকুবের বিনিয়োগকারী ও ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সরোস। তিনি দিয়েছেন ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার।

নিউইয়র্ক শহরের সাবেক মেয়র এবং আর্থিক তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গের প্রতিষ্ঠাতা মাইক ব্লুমবার্গ দিয়েছেন ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান ও তাঁর স্ত্রী মিশেল ইয়ের সম্মিলিত অনুদান ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।

ডেমোক্র্যাটপন্থি শীর্ষ ব্যক্তিগত দাতারা হলেন—

  • জর্জ সরোস: ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার
  • মাইক ব্লুমবার্গ: ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার
  • রিড হফম্যান ও মিশেল ইয়ে: ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার

এবারের নির্বাচনী চক্রে চারজন ব্যক্তি প্রত্যেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন। অধ্যাপক লেসিগের মতে, নির্বাচনে মোট ব্যয়ের চেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অল্প কয়েকজন দাতার হাতে বিপুল অর্থের কেন্দ্রীভবন।

তাঁর ভাষায়, কারও কাছে যদি ১০ কোটি ডলার দেওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে গণতন্ত্রে তাঁর মতামত ও প্রভাবকে অন্যদের মতো গুরুত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কোন প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে?

রাজনৈতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের অনুদানদাতাদের তালিকায় এগিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানি ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোও উল্লেখযোগ্য অর্থ দিয়েছে।

রিপাবলিকানপন্থি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে ওয়ান নেশন। এটি সিনেটে রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এরপর রয়েছে প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটপন্থি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেজরিটি ফরোয়ার্ড এবং হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড।

রিপাবলিকানপন্থি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুদান—

  • ওয়ান নেশন: ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার
  • আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক: ৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার
  • আমেরিকান প্রসপারিটি অ্যালায়েন্স: ৫ কোটি ৭ লাখ ডলার

ডেমোক্র্যাটপন্থি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুদান—

  • মেজরিটি ফরোয়ার্ড: ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার
  • হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড: ৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার
  • ইকোনমিক অপরচুনিটি ফান্ড: ৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার

ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও বড় অঙ্কের অনুদান দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস দিয়েছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। ব্লকচেইনভিত্তিক অর্থ লেনদেন প্রতিষ্ঠান রিপলের অনুদান ৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। ক্রিপ্টো ডটকমের মূল প্রতিষ্ঠান ফোরিস ডিএএক্স দিয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

এ ছাড়া শিল্পগোষ্ঠী কখ দিয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। খেলাধুলায় বাজি ধরার প্রতিষ্ঠান ড্রাফটকিংসের অনুদান ৪ কোটি ৪ লাখ ডলার।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে এসব অনুদানের পরিমাণ দেশটির নির্বাচনী অর্থায়নে ধনকুবের ও বড় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ শুধু নির্বাচনী ব্যয়ের আকার নিয়ে নয়; বরং বিপুল অর্থের নিয়ন্ত্রণ অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং অর্থের প্রকৃত উৎস ভোটারদের কাছে অস্পষ্ট থাকার বিষয়টি নিয়েও।

সূত্র: আল-জাজিরা

ওয়াইএ
আরও পড়ুন