মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি এবার যুক্ত হয়েছে শব্দের লড়াই- আর সেই শব্দ ক্রমেই নিচ্ছে ধর্মীয় রূপ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু কর্মকর্তা সাম্প্রতিক হামলাকে ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করছেন। এতে উদ্বেগ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস, সিএআইআর। তাদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য `বিপজ্জনক' এবং 'মুসলিম-বিদ্বেষী'।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর দেশটিতে ধারাবাহিক বিমান হামলা চলছে। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু ছাড়াও বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও সাইপ্রাসে অবস্থানরত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে।]
সেনাদের কাছে ‘আর্মাগেডন’ বার্তা?
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠন মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন, এমআরএফএফ) জানিয়েছে, কিছু সেনাসদস্য অভিযোগ করেছেন- তাদের বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ 'বাইবেলে বর্ণিত শেষ সময় বা আর্মাগেডনের অংশ'।
একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, এক কমান্ডার সৈন্যদের উদ্দেশে যুদ্ধকে ‘ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনার অংশ’ বলে উল্লেখ করেন এবং বাইবেলের ‘বুক অব রিভেলেশন’ থেকে উদ্ধৃতি টানেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে ‘যিশুর অভিষিক্ত’ বলে উল্লেখ করে ইরানে ‘সংকেতের আগুন’ জ্বালানোর কথাও বলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কূটনৈতিক বক্তব্যেও ধর্মীয় সুর
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাইবেলে প্রতিশ্রুত ভূমির প্রসঙ্গ টেনে ইসরায়েল যদি ‘প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য’ নিয়েও নেয়, তাতেও সমস্যা নেই- যদিও তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের এমন ইচ্ছা নেই।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানকে ‘ধর্মীয় উন্মাদদের দ্বারা পরিচালিত দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন’শাসনের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তোরাহ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানকে বাইবেলের শত্রু জাতি ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আমালেক’কে সম্পূর্ণ অশুভের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
সিএআইআরের অভিযোগ
সিএআইআর বলেছে, ‘আমালেক’ প্রসঙ্গ টেনে অতীতে গাজার ক্ষেত্রেও সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল। একই ভাষা ইরানের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তাদের দাবি। তারা সতর্ক করে বলেছে, ‘পবিত্র যুদ্ধ’ ভাষ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও বিভাজন বাড়াতে পারে।
কেন ধর্মীয় ভাষা?
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় বয়ান রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত করতে কার্যকর। যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটি-এর অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেল বলেন, ঈশ্বরকে নিজের পক্ষে দেখানো হলে যুদ্ধকে নৈতিক বৈধতা দেওয়া সহজ হয়। তবে এতে শত্রুকে অমানবিক করে তোলার ঝুঁকি থাকে, যা ভবিষ্যতের শান্তি প্রচেষ্টাকে কঠিন করে।
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ইন কাতার-এর সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশারিফের ভাষ্য, বাস্তবে সংঘাতটি ভূরাজনৈতিক। কিন্তু ধর্মীয় কাঠামো ব্যবহার করলে সেটিকে 'ভাল বনাম মন্দ'-এর সরল লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা যায়- যা জনমত সংগঠনে কার্যকর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খ্রিস্টান জায়নিস্ট যাজক জন হাগি-এর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ‘শেষ সময়’-এর ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। সূত্র: আলজাজিরা
হরমুজ প্রণালীতে তেল ট্যাংকারে হামলা, ২ ভারতীয় নিহত
ইরাক ও ইসরায়েলে ইরানের বড় হামলা, তেহরান ছাড়ছে মানুষ
