যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে নতুন কৌশলী অবস্থান নিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটন ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জন্য এই পথটি কার্যত ‘বন্ধ’ ঘোষণা করা হলেও, বেশ কিছু দেশকে বিশেষ বিবেচনায় জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, কয়েকটি দেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের জাহাজের জন্য ‘সেফ প্যাসেজ’ বা নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো:
পাকিস্তান: গত রোববার ‘করাচি’ নামের একটি পাকিস্তানি তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে এই প্রণালি পার হয়েছে।
ভারত: ভারতের অন্তত দুটি গ্যাসবাহী জাহাজ এবং আরও কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হওয়ার অনুমতি পেয়েছে। ইরানে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতও এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
তুরস্ক: বিশেষ অনুমতি নিয়ে তুরস্কের একটি জাহাজ ইতোমধ্যে এই জলপথ অতিক্রম করেছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।
চীন: বেইজিংয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ তেল এই রুট দিয়ে আসে। ফলে চীনের জাহাজগুলোর নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
ফ্রান্স ও ইতালি: ইউরোপের এই দুই দেশও তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় তেহরানের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গত ২ মার্চ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হয় যে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করলে তা ‘পুড়িয়ে দেওয়া’ হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬৫ ডলার থেকে একলাফে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে একটি আন্তর্জাতিক নৌজোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি চেয়েছিলেন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে ওই এলাকায় নিজেদের রণতরি পাঠাক।
তবে ট্রাম্পের এই আহ্বানে এখন পর্যন্ত কেউ সাড়া দেয়নি। বরং সোমবার জার্মানি ও গ্রিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা এই সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে বা কোনো বড় যুদ্ধে জড়াতে রাজি নন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক রডজার শানাহান মনে করেন, মার্কিন মিত্ররা শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে, তাই তারা এখন ট্রাম্পের সামরিক জোটে যোগ দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করতে চাইছে না। এছাড়া ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে দ্রুত সেখানে নৌবাহিনী মোতায়েন করাও বড় এক চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ইরান এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।

