যুদ্ধের ২৮তম দিনে এসে চিত্রটা আরও জটিল। একদিকে হামলা চলছে আগের মতোই, অন্যদিকে কূটনীতির টেবিলে নড়াচড়া, কিন্তু দুই বাস্তবতা যেন একে অপরের সঙ্গে মেলে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় পরিকল্পিত হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন, সময়সীমা টেনেছেন ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। তার দাবি, শান্তি আলোচনা 'খুব ভালোই এগোচ্ছে'।
কিন্তু তেহরানের ভাষ্য ভিন্ন। ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব 'একপেশে ও অন্যায্য', আর সেই অবস্থান থেকেই তারা নিজেদের শর্তে অনড়। ফলে যুদ্ধের মাঝেই আলোচনার এই দ্বৈত বাস্তবতা আরও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
ইরানের ভেতরে: হামলা, পাল্টা আঘাত, আর শর্তের লড়াই
ইরানের বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ অব্যাহত। এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৯০০ যা সংঘাতের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
তেহরানও থেমে নেই। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে ইসরায়েলসহ কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও জর্ডানের দিকে। অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন এখন বহু সীমান্ত পেরিয়ে গেছে।
এদিকে আলোচনার প্রসঙ্গে ইরান পাঁচটি “অচল” শর্ত সামনে এনেছেন যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ওয়াশিংটনের কাছে এগুলো গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
মাঠের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তেহরানে থাকা সাংবাদিকরা। তাদের মতে, সাধারণ মানুষ বা নীতিনির্ধারক কেউই কথিত আলোচনার অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না; বরং চলমান হামলাই তাদের কাছে আসল বার্তা।
এর মধ্যেই ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ইরানি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যা যুদ্ধকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
কূটনীতি: বার্তা আদান-প্রদান, শেষ চেষ্টা
এই উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। পাকিস্তান জানাচ্ছে, তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। তুরস্ক ও মিশরও মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এমনকি খুব শিগগিরই দুই পক্ষের সরাসরি বৈঠক হতে পারে এমন আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধ থামানোর শেষ মুহূর্তের চেষ্টা এখনো চালু আছে।
উপসাগরীয় অঞ্চল: প্রতিদিনের আতঙ্ক
ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো প্রায় প্রতিদিনই লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
আবুধাবিতে একটি প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন যারা ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক।
কুয়েতে নিয়মিত সাইরেন, বিস্ফোরণ আর ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনা এখন প্রায় দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র: চাপের ভেতরে ট্রাম্প
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ বাড়ছে। এমনকি ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত কিছু প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে কাতারের প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের দীর্ঘায়ন তার জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ মানুষ তার ইরান নীতিতে অসন্তুষ্ট।
ইসরায়েল: বহু ফ্রন্টে চাপ
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে আরও সেনা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ সরকারকে কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, পর্যাপ্ত কৌশল ছাড়াই বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে, যা দেশকে 'নিরাপত্তা বিপর্যয়ের' দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
লেবাননে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইতোমধ্যে দুই ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন: ছড়িয়ে পড়া সংঘাত
বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে হামলার খবর এসেছে। ইরাকের আনবার প্রদেশে মার্কিন হামলায় কয়েকজন সেনা নিহত ও আহত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইরাকের তেল রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে যা অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা।
লেবাননে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১১১৬ ছাড়িয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, লিতানি নদীর দক্ষিণে ইসরায়েলি দখলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বৈশ্বিক বাজার: তেল, অর্থনীতি, উদ্বেগ
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে বড় পরিসরে আর্থিক সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত। এদিকে ফিলিপাইনে রাশিয়ার তেল পৌঁছানোর ঘটনা দেখাচ্ছে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। সূত্র: আলজাজিরা
ইরান যুদ্ধের ২৭তম দিন, যা ঘটছে
ইরানের নৌ মাইন উৎপাদন স্থাপনায় ইসরায়েলের বিমান হামলা
ইরানের কোমে আবাসিক এলাকায় বিমান হামলায় নিহত ৬
যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হুমকির মুখেও কেন হরমুজে সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান
যুদ্ধের মধ্যেই প্রতিদিন প্রায় ১৪ কোটি ডলার আয় করছে ইরান
আরও ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর কথা ভাবছেন ট্রাম্প
