আমি সানা, বয়স ২৭। তেহরানের পশ্চিমে দুই রুমের ছোট এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকি রুমমেট ফাতেমেহ আর আমার বিড়াল ফানদুঘকে নিয়ে। গত বছরের যুদ্ধ দেখেছি, পালিয়েছি, ভেঙেছি। তাই এবার নিজেকেই কথা দিয়েছিলাম যাই হোক, আর শহর ছেড়ে যাব না।
২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ৪০। আধো ঘুমে ছিলাম, হঠাৎ ফোনের শব্দে সব বদলে গেল। প্রেমিক ফোন করে শুধু বলল ওরা হামলা শুরু করেছে। এর বেশি কিছু বলার দরকার ছিল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে মা, বাবা, বোন, সবাই ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, তেহরান ছেড়ে চলে যেতে। আমি তাকিয়ে ছিলাম আমার বিড়াল ফানদুঘের দিকে। ও তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তখনই সিদ্ধান্ত, আমি কোথাও যাচ্ছি না।
বিকেলে ফাতেমেহ বাসায় ফিরল। প্রতিদিনের দেড় ঘণ্টার পথ সেদিন লেগেছে চার ঘণ্টা। দরজা খুলে ঢুকেই বসে কাঁদতে শুরু করল, প্রথম বিস্ফোরণটা নাকি তার অফিসের একেবারে কাছেই হয়েছিল। সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, এই যুদ্ধ শুধু খবর না এটা আমাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে গেছে।
ধীরে ধীরে যুদ্ধ একটা রুটিনে পরিণত হলো। কখন বোমা পড়তে পারে, আমরা আন্দাজ করতে শিখে গেলাম ভোরে, বিকেলে, আর রাত ১১টার পর। বাইরে যাওয়া বন্ধ। খাবার আসত অনলাইনে। খুব দরকার হলে দৌড়ে দোকান, তারপর আবার ঘরে ফেরা। এর মধ্যে ইন্টারনেটও প্রায় অচল, না সোশ্যাল মিডিয়া, না গুগল। পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ কেটে যাওয়ার মতো অনুভূতি।
১৬ মার্চের রাতটা ভুলব না কোনোদিন। রাত ২টা ৩০। এক বিকট বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আলো, শব্দ, কাঁপন, সব একসাথে। আমরা দৌড়ে নেমে গেলাম পার্কিংয়ের নিচে। আশেপাশে আরও মানুষ। একের পর এক বিস্ফোরণ। মেহরাবাদ বিমানবন্দরের দিকে হামলা হচ্ছিল। সত্যি মনে হয়েছিল, এইবার হয়তো বাঁচব না।
উপরে ফিরে দেখি, আমার বিড়াল আলমারির ভেতর লুকিয়ে কাঁপছে। ফোনে ডজনখানেক মিসড কল, পরিবার, প্রেমিক সবাই ভেবেছে আমি হয়তো আর নেই। সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ কাজ করছিল আমি ওকে একা রেখে নিচে নেমে গিয়েছিলাম।
ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল, আমি যেন নিজের শহরেই শরণার্থী। একদিন বাইরে বের হয়ে দেখি আকাশ কালো হয়ে গেছে দিনের আলোতেই। কোথাও তেল ডিপোতে হামলা হয়েছে। পৃথিবীটা যেন অন্যরকম হয়ে গেছে।
৪ এপ্রিল অফিসে গেলাম। সেদিনই জানা গেল কার চাকরি থাকবে, কার থাকবে না। ৪১ জনের মধ্যে ১৮ জনকে ছাঁটাই করা হলো। এক সহকর্মী কাঁদছিল ভাড়া দেবে কীভাবে, যুদ্ধের মধ্যে কাজ পাবে কোথায়। আমি চাকরি রাখলাম, কিন্তু সেই স্বস্তিও অদ্ভুত রকমের ভারী লাগছিল।
যুদ্ধবিরতির খবর এলো হঠাৎই। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিশ্চিত হওয়ার পর মনে হলো বুকের ওপর থেকে বিশাল একটা বোঝা নেমে গেছে। কিন্তু ঘুম এলো না...এরপর কী?
পরদিন সকালে প্রথম যা করলাম, চুল কাটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম। তারপর নখ ঠিক করলাম। তারপর কিনলাম দামি এক ভিপিএন, অনেক দিন পর আবার সামাজিক মাধ্যমে ঢুকলাম।
ছোট ছোট জিনিস।
যেগুলো আবার মানুষ হওয়ার অনুভূতি ফিরিয়ে দেয়।
(নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম ব্যবহৃত হয়েছে)। মূল লেখা: আরিয়া ফারাহান্দ। সূত্র: আলজাজিরা
মার্কিন নৌ অবরোধ দস্যুতার শামিল: ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবির’ কারণেই আলোচনা ভেস্তে গেছে: আরাগচি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে খালি হাতে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে হবে
দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের শঙ্কায় হরমুজ, বিকল্প পথে আরব দেশগুলো
