অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ভূমিকম্পের মতো পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নেতা মোহসেন রেজাই বলেছেন, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে পারস্য উপসাগর থেকে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। সংঘাতের ছয় মাসের মধ্যে ওয়াশিংটনের নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের জবাবে এমন কড়া বার্তা দিল তেহরান।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি ও জাহাজ চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বহুল আলোচিত অর্থনৈতিক ডি-ডে ঘোষণায় বড় ধরনের নতুন নিষেধাজ্ঞার বদলে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোরভাবে কার্যকরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে পাল্টা চাপের কৌশল নিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দাবা খেলেছে এবং একই সঙ্গে পোকার খেলতেও শিখেছে। এখন দুই কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
হরমুজ ঘিরে বড় ঝুঁকি
ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ। কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আটকে দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানিতে বাধা দিচ্ছে তেহরান। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যেত।
এবার হরমুজের বাইরেও জ্বালানি পরিবহন ও অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প পথে তেল রপ্তানির চেষ্টাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরব ইতোমধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের পথে পাঠানোর চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশও হরমুজ এড়িয়ে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বিকল্প পথে সরিয়ে নিচ্ছে।
তবে এসব বিকল্প রুটও ইরানের নজর এড়ায়নি। তেহরান ৪৫টি তেলবাহী জাহাজের তালিকা প্রকাশ করে জানিয়েছে, নিজেদের নির্ধারিত নিয়ম না মানলে এসব জাহাজ ভবিষ্যতে জরিমানা, আটক কিংবা জব্দের মুখে পড়তে পারে।
ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়তে পারে সংঘাত
তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতাকারী ইউরোপীয় দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে ইরান।
বিশেষ করে বুলগেরিয়ার ভূখণ্ড থেকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান উড্ডয়নের বিষয়টি তুলে ধরে দেশটিকে সতর্ক করেছে তেহরান। বাঘাই বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনে যে দেশ সহায়তা করবে, তাকে আগ্রাসনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার অধিকার ইরানের রয়েছে।
যুদ্ধের গত ছয় মাসে ইরান ১১টি দেশে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বেশির ভাগই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বাহিনী ব্যবহার করে এমন একটি ঘাঁটিতেও হামলার অভিযোগ রয়েছে। ভারত মহাসাগরের গভীরে মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করা দ্বীপগুলোতে পৌঁছানোর সক্ষমতাও ইরান দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ফলে বুলগেরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও ন্যাটোর সদস্য কোনো ইউরোপীয় দেশে হামলা হলে সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে। রেজাই বলেছেন, ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যে দেশ অংশ নেবে বা সহায়তা করবে, তেহরান তাকে যুদ্ধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে।
পারমাণবিক নীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক নীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। তেহরান এতদিন বলে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো লক্ষ্য নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক মহলের একাংশ পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে কথা বলছে।
ইরানের পার্লামেন্টে এ বিষয়ে একটি বিল নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দেশটির আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন। রেজাইও প্রকাশ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রশ্নও সামনে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ একসঙ্গে প্রয়োগ করলেও ইরান সহজে তার মূল অবস্থান থেকে সরে আসবে না। বরং ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অবরোধ যত বিস্তৃত হবে, তেহরান তত বেশি আঞ্চলিক জ্বালানি প্রবাহ, অবকাঠামো ও বাণিজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টির পথ বেছে নিতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপের পাল্টা জবাবে তাই হরমুজ প্রণালি, তেলবাজার ও আঞ্চলিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ এবং ইরানের পারমাণবিক নীতি, সবকিছুই নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। সূত্র: সিএনএন
হরমুজে মাইন অপসারণে ইরান-কাতারের যৌথ উদ্যোগ
অর্থনৈতিক যুদ্ধে শত্রুর পরাজয় নিশ্চিত: গালিবাফ
মুসলিম বিশ্বের মর্যাদা নিশ্চিতে ঐক্যই প্রধান কৌশল: পেজেশকিয়ান