ভবিষ্যতে ইরানের ওপর হামলায় আঞ্চলিক কোনো দেশের মাটি ব্যবহার করা হলে তেহরানের জবাব হবে ভিন্ন ও সুনির্দিষ্ট। রোববার (০৪ অক্টোবর ) এক সংবাদ সম্মেলনে এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, তেহরান প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের নীতি মেনে চলার প্রত্যাশা করে।
বাঘাইয়ের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নবাদী শাসনব্যবস্থার’ হাতে নিজেদের স্থাপনা তুলে দিয়েছিল, তাদের এখন আচরণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে যদি আমেরিকা ও জায়নবাদী শাসনব্যবস্থার আরেকটি আগ্রাসন দেখি এবং ইরানের ওপর হামলায় তাদের মাটি ব্যবহার করা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জবাব হবে ভিন্ন।’
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপের তিক্ত অভিজ্ঞতা অঞ্চলের সব দেশেরই আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। যোগ করেন, ‘আমরা চিরন্তন প্রতিবেশী।’ সামরিক আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ভূখণ্ড ও সুবিধা দেওয়া দেশগুলোকে ইরান দ্রুত ও স্পষ্টভাবে নিজেদের ক্ষোভ জানিয়ে দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার দায় আন্তর্জাতিকভাবে এই দেশগুলোর ওপরও বর্তায়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ইরানি কর্মকর্তারা পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরের প্রায় সব দেশের সঙ্গে ভালো বৈঠক করেছেন বলেও জানান বাঘাই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইসরায়েল অঞ্চলে বিভেদ ছড়াতে চাইছে। যারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি, তাদের হাতে নিজেদের স্থাপনা ও ভূখণ্ড অপব্যবহার হতে না দিতে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
জাতিসংঘে অংশগ্রহণ ‘সফল’
৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের অংশগ্রহণকে দেশটির অন্যতম সফল আন্তর্জাতিক উপস্থিতি বলে বর্ণনা করেন বাঘাই। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বে ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রতিনিধিদল সম্মেলনে যোগ দেয়। তাঁর ভাষ্য, বিভিন্ন দেশের প্রতিপক্ষ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে ইরানের অবস্থান ও যুক্তি তুলে ধরা গেছে।
ইরানের প্রতিনিধিদলের দুই সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের যে দাবি মার্কিন একটি গণমাধ্যমে এসেছে, তাকে তিনি ‘নির্জলা মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর ব্যাখ্যা, ইরানের যাতায়াত, প্রবেশ ও প্রস্থানের সব তথ্য আগেই জানানো ছিল। একজন কূটনীতিক মার্কিন চাপে নিউইয়র্ক ছেড়েছেন, বাকিরা আগের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ফিরেছেন।
বাঘাই বলেন, ‘এটা আয়োজক সরকারের নিজেদের দায়িত্ব লঙ্ঘনের স্বীকারোক্তি। এতে প্রমাণ হয়, জাতিসংঘের আয়োজক হওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই।’ ইরানের অংশগ্রহণ ঠেকাতে ও তেহরানকে একঘরে করতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘সস্তা খবর বানানোর’ পথে হাঁটছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাত দিনের পরিকল্পনা ও হরমুজ প্রশ্ন
কূটনীতির পথ খোলা রাখতে ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা সর্বশেষ উদ্যোগ বলে জানান বাঘাই। তাঁর মতে, এতে বিশ্ব ইরানের দায়িত্বশীল ও শুভেচ্ছাভিত্তিক অবস্থান দেখেছে। তবে আগের অভিজ্ঞতা বলে, মার্কিন পক্ষ কূটনীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয় এবং সব সময় দায় এড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘তাই কূটনীতির কথা বললেও আমরা ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করব। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সজাগ, শক্তিশালী এবং যেকোনো অনিষ্ট প্রতিহত করতে প্রস্তুত।’
কাতারি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পাওয়া মার্কিন প্রস্তাব নিয়ে তিনি জানান, সেগুলো মূলত আগের অবস্থানেরই প্রতিফলন এবং বিশেষভাবে পারমাণবিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর কথায়, ‘আমরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি, এই পর্যায়ে আমাদের মনোযোগ হরমুজ প্রণালিতে।’
প্রণালিতে নিরাপত্তা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পদক্ষেপ দরকার বলে উল্লেখ করেন বাঘাই। এর মধ্যে আছে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা বন্ধ করা, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং হস্তক্ষেপমূলক অন্যান্য পদক্ষেপ থামানো। ইসলামাবাদ বোঝাপড়ায় আগে যা যা ছিল এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নতুন যা যোগ হয়েছে, সবই রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘এই সময়ে আমেরিকার আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।’
ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত তলব
ব্রিটেনের একটি বিমানঘাঁটিতে ঘটা কথিত ঘটনার সঙ্গে তেহরানকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলায় বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে জানান বাঘাই। ব্রিটেনের অভিযোগকে তিনি ‘পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন। কারণ, সামরিক আগ্রাসনে ব্রিটেনের অংশগ্রহণের জন্য ইরান যে জবাবদিহি চেয়েছে, লন্ডন তা জানে।
তিনি বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই, নিজেদের সামরিক ঘাঁটি দিয়ে ব্রিটেন এই অবৈধ যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় ইউরোপের ঘাঁটি ব্যবহারের কথা ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে স্বীকার করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বাঘাইয়ের ভাষ্য, ‘ব্রিটিশ সরকারকে জবাবদিহি করতেই হবে। বানোয়াট দাবি তুলে দায় এড়ানো যাবে না।’
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ‘বরকতময়’
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ‘বরকতময়’ ঘটনা বলে অভিহিত করেন বাঘাই। তাঁর মতে, এটি আমেরিকার ব্যর্থতারও লক্ষণ। ২৩ বছরের দখলদারির সময় আবু গারিব কারাগারসহ যেসব অপরাধ হয়েছে, তা স্মরণ করে তিনি বলেন, দখলদারিই দায়েশ ও তাকফিরি সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিদেশি দখলদারি সহিংসতা, বিভেদ ও নিরাপত্তাহীনতার ভিত্তি তৈরি করে।’ এই পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করবে এবং ইরাকের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সূত্র: প্রেস টিভি
পরমাণু কর্মসূচি ইরানের অবিচ্ছেদ্য অধিকার: রুশ দূত
মার্কিন বাহিনী দূরে সরতেই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়াবে ইরান
অর্থনৈতিক যুদ্ধে শত্রুর লক্ষ্য পূরণ হতে দিইনি: পেজেশকিয়ান
ইরানের নতুন স্যাটেলাইট পার্স-২ উৎক্ষেপণের অপেক্ষায়
লড়াইও করবে, আলোচনাও চালাবে ইরান: গালিবাফ