তেহরানের রাস্তায় ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ, বিলবোর্ডে ফুটছে যুদ্ধের গল্প

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে আর ইরানি সৈনিকের বুটের নিচে মার্কিন ড্রোন দেখিয়ে তেহরানের দেয়ালে দেয়ালে তোলা হচ্ছে বিশাল সব বিলবোর্ড। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলা ইরানের যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যেন এসব ছবিতেই ধরা পড়ছে।

এমন বিলবোর্ড বানানোর একটি দলের কাজ কাছ থেকে দেখার বিরল সুযোগ পেয়েছে এএফপি। শহরের বিখ্যাত ভালিয়াসর স্কোয়ারসহ যেসব জায়গা দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করে, সেখানেই বসানো হয় এই ধরনের বিলবোর্ড।

‘খানেহ-ই তাররাহান’ বা ‘ডিজাইনার্স হাউস’ নামের স্টুডিও বানিয়েছে ট্রাম্পের একটি বিশাল ছবি। তাতে তাঁর ঠোঁট সেলাই করা, আর মুখ বন্ধ করে রেখেছে হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ ঘিরেই এখন যুদ্ধের মূল টানাপোড়েন। ছবির সঙ্গে লেখা: ‘ভাঙনের মুখে’।

স্টুডিওর ব্যবস্থাপক ৩২ বছর বয়সী মোস্তফা কাফায়ি বলেন, ‘খবর এলেই দল কাজে নেমে পড়ে। প্রথমে ভাবনা আসে, তারপর গ্রাফিক ডিজাইনারদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এরপর সবাই মিলে কাজ করি।’ তিনি কথা বলার সময় অফিসের কয়েকটি ডেস্কে কাজ চলছিল। সেখানে আছে ভাবনা লেখার জন্য একটি হোয়াইটবোর্ড, আর করিডোরের দেয়ালে শহীদদের ছবির পাশে ঝুলছে নানা ভাবনার নকশা।

কাফায়ির স্টুডিওতে খবরের ওপর নজর রাখার জন্য আলাদা একটি দলও আছে। দেশের অন্যতম বড় সরকারি গণমাধ্যম গোষ্ঠীর অধীনে চলে প্রতিষ্ঠানটি। সরকারই এসব বিলবোর্ডের পৃষ্ঠপোষক, আর নিজেদের বার্তা দূর-দূরান্তে পৌঁছে দিতে এগুলো ব্যবহার করা হয়।

অন্য একটি স্টুডিওর বিলবোর্ডে ট্রাম্পকে দেখা যায় এক জাদুর বাক্সে আটকা অবস্থায়, হাতে কোকাকোলা আর হ্যামবার্গার। সঙ্গে লেখা: ‘পলক ফেললেই উধাও!’ জুলাইয়ে তুরস্কে ঘটা একটি ঘটনার ইঙ্গিত আছে এতে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে তখন ট্রাম্পকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে খাবার সরবরাহের একটি ট্রাকে করে গোপনে অন্য বিমানে নেওয়া হয়েছিল। ৩১ আগস্ট ডাউনটাউনের একটি ভবনে এমন একটি বিলবোর্ডও দেখা গেছে, যাতে ট্রাম্প খাবার সরবরাহের কনটেইনারের ভেতরে।

কাফায়ি জানান, এখন গতিই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। জরুরি পোস্টার কয়েক দিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায়, কাজ করেন আট জনের মতো মানুষ। বেশির ভাগ কাজ হয় ফটোশপে। তাঁর ভাষায়, দলটি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বেশ দক্ষ’, আর নির্মাণপ্রক্রিয়ায় চ্যাটজিপিটি ও ন্যানো ব্যানানার মতো নানা এআই ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

গণমাধ্যমের লড়াই

সম্প্রতি তেহরানে আরেকটি বিশাল বিলবোর্ড উঠেছে। তাতে এক ইরানি সৈনিক মার্কিন একটি পানির নিচের ড্রোন পায়ের নিচে চেপে ধরে আছেন। বিপ্লবী গার্ডের সাম্প্রতিক ‘হরমুজের শিকার’ নিয়ে গর্ব করে লেখা হয়েছে: ‘ব্যবসা জমজমাট’।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। তার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোয় অবরোধ বজায় রেখেছে।

আরেকটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, উত্তাল সাগরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন পৌরাণিক এক যোদ্ধা, আর পেছনে জ্বলছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। লেখা আছে: ‘শয়তানের বাহিনী আরব উপসাগরে ডুবে মরবে।’ নির্ভানার ‘নেভারমাইন্ড’ অ্যালবামের প্রচ্ছদের আদলে বানানো আরেকটিতে দেখা যায়, পানির নিচে ডলারের নোট আঁকড়ে ধরেছেন ট্রাম্প। পাশে লেখা: ‘মহাবিজয়! হরমুজ প্রণালি’।

মে মাসে হরমুজ প্রণালি যখন সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসে, তখনই ট্রাম্পের সেলাই করা ঠোঁটের ছবিটি ভালিয়াসর স্কোয়ারে ওঠে। কাফায়ি বলেন, ভালিয়াসরের দেয়ালচিত্রে ট্রাম্পের মুখের এত বড় ছবি রাখা হবে কি না, তা নিয়ে শুরুতে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু ‘সার্বিক মূল্যায়নে দাঁড়াল, শেষ কাজটি হবে অসাধারণ শক্তিশালী।’

এত বিলবোর্ডে কেন ট্রাম্পই, এই প্রশ্নে কাফায়ির উত্তর: ট্রাম্প ‘একজন গণমাধ্যম-ব্যক্তিত্ব.. তিনি সেই অঙ্গনে কিছু করলে আমরাও একই ভাষায় জবাব দিই।’ বিষয়টিকে তিনি তুলনা করেন যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে, যেখানে প্রতিপক্ষ ‘ক্রমাগত গুলি চালাচ্ছে’। তাঁর কথায়, ‘আমরা প্রতিপক্ষের ওপর কড়া নজর রাখি এবং সেভাবেই জবাব দিই।’

‘শয়তানের বিয়ের উপহার’

ইরানের গৌরব, যুদ্ধের শুরুতে নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং নিহত হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহর মতো মিত্রদের মহিমা তুলে ধরা বিলবোর্ডও শহরের নানা জায়গায় উঠেছে। কাফায়ির মতে, যাঁরা হয়তো রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান না, এসব বিলবোর্ড তাঁদেরও ‘দেশে কী ঘটছে, তার সার্বিক প্রেক্ষাপট’ বুঝতে সাহায্য করে।

৫৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মাহমুদরেজা রেজায়ি এমন একটি বিলবোর্ডের কথা মনে করেন, যেখানে ‘শয়তানের বিয়ের উপহার’ কথাটি লেখা। গত মাসে দেশের দক্ষিণে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে কথিত মার্কিন হামলায় কয়েকজন নিহত হন। রেজায়ির বোঝাপড়া, বার্তাটি ট্রাম্পের উদ্দেশেই। তিনি বলেন, ‘কয়েক মিনিট ভাবিয়েছে, অর্থটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। ধাঁধার মতো একটা ব্যাপার ছিল।’

২৪ বছর বয়সী ফার্মেসিকর্মী সাহার জাহেদি বলেন, মধ্য তেহরানের জমহুরি স্কোয়ারে ওঠা জাদুর বাক্সে আটকা ট্রাম্পের বিলবোর্ডটি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর মতে, এখন অনেক মানুষ টিকে থাকার লড়াই করছেন, খবর অনুসরণ করার সময় তাঁদের নেই। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বিলবোর্ড... আরও বেশি মানুষকে সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে জানাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’

সূত্র: আরব নিউজ

এটিটিআর
আরও পড়ুন