তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানে অন্তত ২৩৩ জন আফগান নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস। সংস্থাটির নথিভুক্ত হিসাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগান নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ অনেক মৃত্যুদণ্ডের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ওই বছরের বাকি সময়ে পাঁচজন আফগান নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২২ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ জনে, ২০২৩ সালে ২৫ জনে, ২০২৪ সালে ৮০ জনে এবং ২০২৫ সালে অন্তত ৮৪ জনে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আরও ২৩ জন আফগান নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তুলনায় ২০২৫ সালে সংখ্যাটি বেড়ে ৮৪ জনে দাঁড়ায়, তিন বছরে বৃদ্ধি ৪২৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে ৮০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল; পরের বছর তা আরও প্রায় পাঁচ শতাংশ বাড়ে। ইরান হিউম্যান রাইটস বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ সব মৃত্যুদণ্ডের তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে তাদের সংগৃহীত পরিসংখ্যানেও সব ঘটনা অন্তর্ভুক্ত না-ও হতে পারে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আফগান নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ডের কেবল একটি অংশই ইরানের সরকারি সূত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
ইরানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আফগান নাগরিকদের বেশির ভাগই হত্যা ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ বছরের সেপ্টেম্বরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তুরাত মোহাম্মদি নামে এক আফগান নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্যও প্রকাশ করে তারা। সংস্থাটির দাবি, তার মৃত্যুদণ্ড গোপনে কার্যকর করা হয় এবং এ বিষয়ে আগে থেকে তার পরিবারকে জানানো হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড কমানোর আহ্বান তালেবানের
আফগান বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড ও তাঁদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তালেবানের সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক উপপ্রধান আবদুল মালিক হাক্কানির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করে। সফরে ইরানের বিচার বিভাগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক ও মানবাধিকারবিষয়ক উপপ্রধান কাজেম গারিবাবাদির সঙ্গে বৈঠকে আফগান বন্দিদের বিষয়টি তোলা হয় বলে তালেবানের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে।
বৈঠকে ইরানের কাছে আফগান বন্দিদের একটি তালিকা চাওয়া হয়, বিশেষ করে যাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে তাঁদের তথ্য। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে বিকল্প শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানায় তালেবান প্রতিনিধিদল। ইসলামি নীতি ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আফগান বন্দিদের প্রতি নমনীয়তা দেখানোর অনুরোধ করেন হাক্কানি। প্রতিশোধমূলক শাস্তি হিসেবে পরিচিত কিসাসের আওতায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বন্দিদের তালিকাও চাওয়া হয়।
তালেবানের ভাষ্য অনুযায়ী, একই বৈঠকে ইরানি কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১ হাজার ৫০০ আফগান বন্দিকে আফগানিস্তানে স্থানান্তরের কথা রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে বিকল্প শাস্তি দেওয়ার অনুরোধে ইরানের পক্ষ থেকে কী সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল, সে বিষয়ে বৈঠকের বিবরণে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
বিচার ও বন্দিদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া আফগান বন্দিদের পরিবারগুলোর পক্ষে মামলা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আফগান নাগরিক আবদুল্লাহ তাজিকের ভাই রুহুল্লাহ হামিদি জানান, মাদক পাচারের অভিযোগে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তার ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তার ভাই অভিযোগটি অস্বীকার করেছিলেন বলে জানান হামিদি।
হামিদির দাবি, তার ভাইয়ের মুক্তির জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষ ১০০ বিলিয়ন তোমান জামিন নির্ধারণ করেছিল, যা পরিবারের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না। তার ভাই নিজের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগও পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তেহরানে তালেবানের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে জানানো হয়, আবদুল্লাহ তাজিককে আফগানিস্তানে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইরানেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মোহাম্মদ ইউসুফ নামে আরেক আফগান নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। তার পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউসুফ ইরানের একটি কারখানায় কাজ করতেন। কারখানাটিতে হামলাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের পর তাঁকে আরেক আফগান শ্রমিকের সঙ্গে আটক করা হয়। পরে ইউসুফের মৃত্যু হলেও কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন। তারা ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি জানার দাবি জানিয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে ইরানি কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করা হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানে মৃত্যুদণ্ডের মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে স্বাধীন আইনজীবীর সীমিত সুযোগ, নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের আশঙ্কা এবং বিদেশি বন্দিদের ক্ষেত্রে পরিবার ও কনস্যুলার সহায়তার ঘাটতি। ইরান হিউম্যান রাইটসের মতে, অনেক আফগান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির শক্তিশালী পারিবারিক সহায়তা নেই এবং পর্যাপ্ত আইনি প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগও সীমিত।
এদিকে, মানবাধিকারকর্মীদের সংবাদ সংস্থা এইচআরএনএ ৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ইরানে অন্তত ২ হাজার ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আগের সমপর্বের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। সংস্থাটির হিসাবে, ওই সময়ে নথিভুক্ত মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশের তথ্য সরকারি সূত্রে প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মৃত্যুদণ্ডবিরোধী দিবস পালিত হয়। এ দিবসের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলো ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যাপকতা এবং বন্দিদের পরিবারগুলোর তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে না জানানো এবং মামলার তথ্যের সীমিত প্রাপ্যতা নিয়েও উদ্বেগ রয়ে গেছে। সূত্র: আফগান ইন্টারন্যাশনাল
রক্তপিপাসু শত্রুর বিরুদ্ধে অবিচল ইরান: ফাতেমেহ মোহাজেরানি
সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলা
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা, সৌদির প্রতি নেতানিয়াহুর শোক ও সমবেদনা
হরমুজে মাইনের আঘাতে তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কারে আগুন: আইআরজিসি