ইরান যুদ্ধে নতুন মেরুকরণ, হুথিদের ঠেকাতে আঞ্চলিক উদ্যোগ

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫২ পিএম

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ। এ লক্ষ্যে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সাত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হওয়ার কথা। এতে তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, হরমুজ ও বাব আল-মানদাব প্রণালির নিরাপত্তা, ইয়েমেন পরিস্থিতি এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে আলোচনা হবে বৈঠকে।

ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলা, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এই বৈঠক হচ্ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইস্তাম্বুলের এই উদ্যোগ আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক আলোচনা থেকে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।

এই উদ্যোগের সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলা ও তার আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখার সময় আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় আলাদা উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এ ধরনের সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার সঙ্গে সমন্বিত কোনো একক জোট তৈরি করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

আঞ্চলিক আলোচনা থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

গত মার্চ থেকে হুথিদের বাব আল-মানদাব প্রণালি ঘিরে হুমকির পর তুরস্ক, মিসর, পাকিস্তান ও সৌদি আরব নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে আসছে। এই চার দেশের গোষ্ঠীটি ‘আর৪’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ইরান যুদ্ধ, ফিলিস্তিন পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশগুলো অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে। সংকট সমাধানে আঞ্চলিক দেশগুলোর সরাসরি ভূমিকার ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছে।

কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের কোনো একটির ওপর বাইরের সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গত ৩১ আগস্ট তিন দেশের কর্মকর্তারা যৌথ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হন। পরে ৫ অক্টোবর তাদের প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠকে সৌদি আরবে দ্রুত মোতায়েনের জন্য নির্ধারিত বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ১১ অক্টোবর এক বিবৃতিতে চারটি আর৪ দেশ সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলার নিন্দা জানায় এবং হুমকি মোকাবিলায় রিয়াদের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানায়।

তুরস্কের পার্লামেন্টে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিতে সেনা মোতায়েন করা হবে কি না, সে বিষয়ে আগামী ২৬ অক্টোবর মিসরের পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। মিসর চুক্তির সদস্য নয়, তবে দেশটির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দেশগুলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের কথাও বলছে। তাদের কয়েকটি দেশের সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। ফলে একদিকে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা, অন্যদিকে হুথিদের হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, দুই ধরনের উদ্যোগই পাশাপাশি এগোচ্ছে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও হুথি হুমকি

তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা। ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা এবং বাব আল-মানদাব প্রণালির নিরাপত্তাহীনতা দেশটির জ্বালানি রপ্তানি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ওপর চাপ তৈরি করেছে।

নতুন সহযোগিতার মাধ্যমে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হলে এসব ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে এ ধরনের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তুরস্ক ও পাকিস্তানের বড় ভূমিকা এবং চার আঞ্চলিক দেশের সমন্বয় সেই নির্ভরতা কমাতে পারে। এতে ওয়াশিংটন ইরান যুদ্ধের দিকে আরও বেশি সামরিক সম্পদ ও মনোযোগ দিতে পারবে, এমন সম্ভাবনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দুটি সমান্তরাল কৌশল গড়ে উঠতে পারে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি ইরানের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগ করছে। অন্যদিকে ইস্তাম্বুলের বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলো ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর আঞ্চলিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তবে দুই উদ্যোগকে একই সামরিক জোটের অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়া এড়িয়ে চলছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা করলেই ইসরায়েলের সামরিক কৌশলে অংশ নিতে হবে, এমন অবস্থান তারা নেয়নি। বরং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি হুথিদের হামলার মতো আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে তারা।

ইরানের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

ইস্তাম্বুলকেন্দ্রিক এই উদ্যোগ সফল হলে তা ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, হুথিরা তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ কার্যকর হলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে ভৌগোলিক অবস্থান এবং হুথিদের প্রতি সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের ব্যয় বাড়াতে চাইছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরান জানিয়েছে, তাদের স্বার্থে আঘাত এলে জবাব দেওয়া হবে। সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিক সুবিধায় রূপ দিতে কূটনীতিও চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে সাত দিনের একটি প্রস্তাব কাতারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে তা বাস্তবায়ন নির্ভর করছে তেহরানের শর্ত পূরণের ওপর। ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরব ও আনসারুল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতা করতেও ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে হুথিরা সরাসরি তেহরানের নির্দেশে কাজ করে, এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন আরাঘচি।

এসব বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, আঞ্চলিক চাপকে রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ধরে রাখতে চায় ইরান। কিন্তু সৌদি আরবসহ যেসব দেশ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা ও সমুদ্রপথে বিঘ্নের ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তারা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ালে তেহরানের এই কৌশল কিছুটা দুর্বল হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ইরান-সমর্থিত বাহিনীকে সামরিকভাবে পরাজিত করাই একমাত্র উপায় নয়। সৌদি আরব নতুন অংশীদারদের সহায়তায় নিজের অবকাঠামো আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করতে পারলে এবং বাব আল-মানদাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি কমলে তেহরানের আঞ্চলিক দর-কষাকষির ক্ষমতার একটি অংশ হ্রাস পেতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা এসব উদ্যোগে সরাসরি বদলে যাবে না। দেশটির প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর পরিস্থিতির গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।

এ ছাড়া আনসারুল্লাহ বা হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক দাবিও রয়েছে। তাই ইয়েমেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলাদা সমঝোতা প্রয়োজন হবে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরের সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগ অব্যাহত থাকাও ইঙ্গিত দেয়, উত্তেজনা কমাতে ইরানের ভূমিকার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না দেশগুলো। আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সৌদি আরবের অবকাঠামোয় হুথিদের হামলা বন্ধে তেহরানকে নিজের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ইউরোপের অংশগ্রহণে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাবনা

ইস্তাম্বুলের বৈঠকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির অংশগ্রহণ এই সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে পারে। যুদ্ধের বৃহত্তর প্রভাব, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিঘ্ন এবং বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা বাড়াতে চাইছে। তবে তাদের অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে সামরিক ভূমিকা সম্প্রসারণের পথও তৈরি করতে পারে।

তুরস্কের জন্য এই বৈঠক আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজের ভূমিকা জোরদার করার সুযোগ। সৌদি আরব আঞ্চলিক অংশীদারদের প্রতিরক্ষা সহায়তার পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনা বিস্তৃত করতে পারবে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো এমন কয়েকটি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও তেহরানের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে। এতে ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার পাশাপাশি দেশটির কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা জানানোর সুযোগও থাকছে।

এই প্রক্রিয়া এগোলে আঞ্চলিক চার দেশের রাজনৈতিক সহযোগিতা, তিন দেশের প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার এবং ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয় মিলিয়ে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। তবে তা অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির বিকল্প হয়ে উঠবে না এবং ইসরায়েলের কৌশলের সঙ্গেও পুরোপুরি একীভূত হবে না। বরং সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকা বাড়তে পারে, যে লক্ষ্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরেছেন।

সব মিলিয়ে, ইস্তাম্বুলের বৈঠক ইরান যুদ্ধ ঘিরে দুটি সমান্তরাল উদ্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি সামরিক চাপ, অন্যদিকে ইউরোপের অংশগ্রহণে আঞ্চলিক দেশগুলোর মাধ্যমে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এসব উদ্যোগ উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে, তবে সমন্বিত প্রতিরক্ষা পদক্ষেপের বিস্তার নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এএস
আরও পড়ুন