সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে নড়বড়ে ট্রাম্প প্রশাসন

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কঠোর লক্ষ্যগুলোর তালিকা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। যুদ্ধের ষষ্ঠ মাসে এসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষণ করেছেন সিএনএনের অ্যারন ব্লেক।

বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স দুটি লক্ষ্য তুলে ধরেন। প্রথমত, উপসাগরীয় দেশগুলো যেন বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকে। দ্বিতীয়ত, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।

ভ্যান্সের বক্তব্যের পর শুক্রবার (১৫ আগস্ট) হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লিভিট বলেন, দুটি লক্ষ্যই ট্রাম্পের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্লেষক ব্লেকের মতে, বক্তব্যে জ্বালানি সরবরাহ ও দামকে প্রথম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তেল ও গ্যাসের সরবরাহ চলছিল। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা মূলত যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য। এর বিপরীতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কোনো অর্জন হতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত। এর মধ্যে ছিল ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ বন্ধ করা এবং হিজবুল্লাহর মতো মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা।

এ ছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস এবং দেশটির বিমান ও নৌ সক্ষমতা দুর্বল করার মতো লক্ষ্যও উঠে এসেছিল। তবে কোন কর্মকর্তা কখন কথা বলছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এসব লক্ষ্যের তালিকায় পার্থক্য ছিল। ফলে যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলো নিয়ে এক ধরনের পরিবর্তনশীল অবস্থান দেখা যায়।

বিশ্লেষক ব্লেকের মতে, সময়ের সঙ্গে সেই লক্ষ্য আরও সংকুচিত হয়েছে। মে মাসের মধ্যেই প্রশাসন কিছু লক্ষ্য নিয়ে জোর দেওয়া কমিয়ে দেয়। জুনে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার পরও আগে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা বেশ কয়েকটি লক্ষ্য তাতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যুদ্ধের আগে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের ওপর জোর দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প বলতে শুরু করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে হয়তো যথেষ্ট ক্ষতি করা হয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক উপকরণ এত গভীরে পুঁতে রাখা হয়েছে যে সেগুলো উদ্ধার করা কঠিন।

এমনকি ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। জুলাইয়ে তিনি আরও দাবি করেন, ইরান ইতোমধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত হয়ে গেছে।

এ পরিস্থিতিতে ভ্যান্সের বক্তব্যকে প্রশাসনের যুদ্ধ শেষ করার প্রস্তুতিতে লক্ষ্য শিথিল করার আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন ব্লেক। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুরুতে যে যুদ্ধকে ইরানের আত্মসমর্পণ ও বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আদায়ের অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটি এখন অন্তত কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে এসে ঠেকেছে।

আর সেটিই ইরান যুদ্ধ কতটা কাঙ্ক্ষিত ফল দিয়েছে, সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এখন প্রধান লক্ষ্য হিসেবে হরমুজ দিয়ে তেল ও গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ এবং দেশে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণকে সামনে রাখে, তাহলে তা যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল, তার তুলনায় অনেক সীমিত ফলাফলের ইঙ্গিত দেয়। সূত্র: সিএনএন

AS
আরও পড়ুন