অপরিকল্পিত নগরায়ন

সিউল ও টোকিও থে‌কে ঢাকা কী‌ শিক্ষা নি‌তে পা‌রে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

নগরে যানজট, জনঘনত্ব ও পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। নাজুক হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। দিনে দিনে এ শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপ‌টে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও জাপানের টোকিও শহর দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই শহরে উচ্চ জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।

সিউল বহু বছর ধরেই দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী শহর। তবে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে ১৯৭০-এর দশক থেকেই পরিকল্পিতভাবে সিউলের চারপাশে একাধিক স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলে দেশটির সরকার। এসব নতুন শহর মহাসড়ক, মেট্রোরেল ও দ্রুতগতির ট্রেনের মাধ্যমে সিউলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে মানুষ সহজে সিউলের সঙ্গে যাতায়াত করতে পারে।

একই সঙ্গে সিউলে শিল্পকারখানা ও সরকারি দপ্তরের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ঠেকাতে কড়াকড়ি নীতি নেওয়া হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সেজং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সিটি। সিউল থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে গড়ে ওঠা এই শহরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তর স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে রাজধানীর ওপর প্রশাসনিক চাপ কমেছে। এতে দেশের অন্য অঞ্চলেও উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে জাপানের রাজধানী টোকিও দেখিয়েছে, কীভাবে উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা একটি অতিঘন শহরকে বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। টোকিওতে মেট্রো, ট্রেন ও বাসের এমন বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা আছে যে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজন অনেক কমে গেছে। অনেক এলাকাতেই প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করলেও শহরটি অগোছালো বা অসহনীয় মনে হয় না।

টোকিওর পরিকল্পনায় আবাসন, অফিস, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল ও পার্ক—সবকিছু কাছাকাছি রাখা হয়েছে। ফলে মানুষকে দৈনন্দিন প্রয়োজনে দূরে যেতে হয় না। হাঁটা ও গণপরিবহনই সেখানে প্রধান ভরসা। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হয়, পাশাপাশি দূষণও কমে।

টোকিওর আরেকটি বড় শক্তি হলো নাগরিকদের শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই গণপরিবহন ব্যবহার করেন। নগরজীবনে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সামগ্রিক সুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়ার এ সংস্কৃতিই শহরটিকে টেকসই করেছে।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা। প্রায় সব প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজধানীতেই। এতে গ্রাম ও ছোট শহর থেকে মানুষ ঢাকায় ভিড় করছে। চাপ বাড়ছে অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর।

সিউল ও টোকিওর অভিজ্ঞতা থেকে ঢাকার জন্য তিনটি বিষয় শেখা জরুরি। প্রথমত, রাজধানীর চাপ কমাতে পরিকল্পিতভাবে সরকারি দপ্তর ও শিল্প অন্য শহরে সরিয়ে দেওয়া; দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা; এবং তৃতীয়ত, পরিকল্পিতভাবে প্রয়োজনীয় সেবা মানুষের কাছাকাছি রাখা।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনঘনত্ব কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হয় তখনই, যখন সেটিকে পরিকল্পনা ও ন্যায়সংগতভাবে পরিচালনা করা হয় না। সিউল ও টোকিও দেখিয়েছে, সঠিক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে ঘন শহরও হতে পারে নিরাপদ, কার্যকর ও মানুষের জন্য উপযোগী।

AHA
আরও পড়ুন