ইরানের সস্তা ড্রোনেই নিখুঁত আক্রমণ

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশপথের লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে ইরান। পশ্চিমা দেশগুলোর কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানকে টেক্কা দিচ্ছে তেহরানের তৈরি অত্যন্ত স্বল্প মূল্যের কামিকাজে ড্রোন।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে ইরান সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন সংঘাতের সূচনা হয়েছে। তেহরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস করা হলেও, দেশটি পারস্য উপসাগরীয় প্রায় প্রতিটি দেশে ড্রোন হামলার এক বিশাল ঢেউ নামিয়ে দিয়েছে। 

ইরানি ড্রোনগুলো কেবল সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, লেবানন ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা সামরিক ঘাঁটিগুলোকেই লক্ষ্য করেনি, বরং জ্বালানি অবকাঠামো, বাণিজ্যিক বিমানবন্দর ও বিলাসবহুল হোটেলেও আঘাত হেনেছে। এমনকি আজারবাইজান ও তুরস্কও ইরানের ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি আকৃতিরিতে ড্রোন হামলার পর বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ ওই অঞ্চল রক্ষায় নৌজাহাজ মোতায়েন করেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫ মার্চের মধ্যে ড্রোন হামলার তীব্রতা ৮৩ শতাংশ হ্রাস পেলেও এই অভিযানের ব্যাপ্তি ছিল স্তম্ভিত করার মতো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ২ হাজারেরও বেশি স্বল্পমূল্যের 'শাহেদ-১৩৬' কামিকাজে ড্রোন প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। এই সংখ্যাটি ২০২৫ সালের শেষে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার চালানো সর্বোচ্চ হামলার চেয়েও কিছুটা বেশি। বর্তমানে ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাশিয়া প্রতিদিন গড়ে ১৪৩টি ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে দূরপাল্লার নিখুঁত হামলা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক বিলাসিতা। তবে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন কৌশলের জন্ম দিয়েছে, যাকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন 'প্রিসাইজ মাস' বা সস্তা ড্রোনের মাধ্যমে ব্যাপক ও নিখুঁত আক্রমণ। এই ধারায় শামিল হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি রণক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব 'লুকাস' ড্রোন মোতায়েন করেছে। ইরানি শাহেদ-১৩৬-এর আদলে তৈরি এই ড্রোনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন যেন ইরানকে তাদের নিজের ওষুধেই ঘায়েল করতে চাইছে।

মারাত্মক এই ড্রোনগুলো এখন প্রতিরক্ষা বাজেট এবং অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রোনকে কেবল 'চালকবিহীন বিমান' বা 'রিমোট কন্ট্রোলড যান' হিসেবে গণ্য করার ফলে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রাণঘাতী অস্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস দ্রুত স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যথায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই এই প্রযুক্তি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন প্রিডেটর বা রিপার ড্রোনের উদ্ভাবন করেছিল, সেগুলো ছিল কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের একেকটি উড়ন্ত প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখন সস্তা ও আত্মঘাতী ড্রোনের যুগ। শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের দাম মাত্র ২০ হাজার ডলারের কাছাকাছি, যা সাধারণ ইঞ্জিন ও বাজার থেকে কেনা যায় এমন সাধারণ যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি। বিপরীতে একেকটি ক্রুজ মিসাইলের দাম ২০ থেকে ৪০ লাখ ডলার। ফলে সামরিক বাহিনীগুলো এখন দামী মিসাইলের বদলে সস্তা ও গণহারে ব্যবহারযোগ্য ড্রোনকে 'কনজিউমেবল কমোডিটি' বা ব্যবহারযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখছে।

রাশিয়া বর্তমানে তাদের তাতারস্তান প্ল্যান্টে শাহেদ ড্রোনের উন্নত সংস্করণ 'গেরান-২' উৎপাদন করছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তারা মাসে ৩ হাজার ড্রোন তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে চীন এখন ড্রোনের বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রের মূল নিয়ন্ত্রক। ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় পক্ষই তাদের ড্রোনের যন্ত্রাংশের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে চীনের ড্রোন যন্ত্রাংশ রপ্তানি গত বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে সস্তা ড্রোনের এই আক্রমণাত্মক ব্যবহারের একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কয়েক লাখ ডলার মূল্যের মিসাইল ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ইউক্রেন অবশ্য এ ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন দেখিয়েছে। তারা আকাশজুড়ে হাজার হাজার সেন্সর বসিয়ে 'স্কাই ফোর্টেস' নামক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে যা ড্রোনের ইঞ্জিনের শব্দ শুনে অবস্থান শনাক্ত করে এবং সস্তা বিমান বিধ্বংসী কামানের মাধ্যমে তা ধ্বংস করে।

ড্রোন যুদ্ধের এই বিস্তৃতি আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ২০১৬ সালের যৌথ ঘোষণাপত্রকে আধুনিকীকরণ করা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। 

AHA
আরও পড়ুন