গ্রিনল্যান্ডে কয়েক দশক ধরে নারীদের ওপর জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োগের ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে দুটি বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে এই কর্মকাণ্ডকে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন প্রতিবেদনের বিশেষজ্ঞরা।
ঘটনাটি মূলত ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলা একটি জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে ঘিরে। ওই সময়ে অন্তত ৪ হাজার গ্রিনল্যান্ডীয় নারী ও কিশোরীর শরীরে তাদের যথাযথ সম্মতি ছাড়াই জরায়ুতে গর্ভনিরোধক ডিভাইস (আইইউডি) স্থাপন অথবা গর্ভনিরোধক ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী মেয়েরাও ছিল।
তৎকালীন ডেনিশ কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ছিল গ্রিনল্যান্ডে জন্মহার ও পরিবারের আকার কমানো। সে সময় জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল এবং জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির ফলে জন্মহার নিয়ন্ত্রণকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে অনেক নারীকে প্রয়োজনীয় তথ্য না দিয়েই এসব গর্ভনিরোধক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
এর ফলে অনেক নারী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যজটিলতার শিকার হন। নথিভুক্ত সমস্যার মধ্যে অতিরিক্ত রক্তপাত, গুরুতর সংক্রমণ, ফ্যালোপিয়ান টিউবে ক্ষত, জরায়ু অপসারণ এবং পরবর্তী সময়ে সন্তান ধারণে অক্ষমতার মতো ঘটনা রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত তদন্তে গণহত্যার আইনি সংজ্ঞা নিয়েও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হয়। দুটি বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণের ঘটনায় গ্রিনল্যান্ডের জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে গণহত্যা বলা যায় না। অন্যদিকে আরেকটি প্রতিবেদনে চূড়ান্তভাবে গণহত্যা হয়েছে বা হয়নি—কোনোটিই নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ডেনমার্কের তৎকালীন অন্যান্য নীতির প্রভাবসহ আরও বিস্তৃত তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে দুই পক্ষই একমত যে, যথাযথ সম্মতি ছাড়া নারীদের ওপর গর্ভনিরোধক প্রয়োগ তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন এবং কিছু ক্ষেত্রে অবমাননাকর আচরণের শামিল।
এই ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছেন। ডেনমার্কের সরকার ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের প্রতি ক্ষমা চেয়েছে এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও অনুমোদন করেছে। প্রত্যেক যোগ্য ভুক্তভোগীকে ৩ লাখ ডেনিশ ক্রোনার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড সরকারও ভবিষ্যতে একটি পুনর্মিলন কমিশন গঠনের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এর লক্ষ্য হবে দীর্ঘদিনের এই ঘটনার সামাজিক ও প্রজন্মগত ক্ষত মোকাবিলা এবং ডেনমার্ক-গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কের এই অন্ধকার অধ্যায় থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা।
গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৫৭ হাজার। কয়েক দশক আগের এই জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ঘটনা তাই শুধু ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এটি গ্রিনল্যান্ডের উপনিবেশিক ইতিহাস, আদিবাসী ইনুইট জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং ডেনমার্কের সঙ্গে দ্বীপটির দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে ‘গণহত্যা’ নিয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—সম্মতি ছাড়া হাজারো নারী ও কিশোরীর ওপর জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। সেই অতীতের দায় স্বীকার, ক্ষতিপূরণ এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের প্রশ্নই এখন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে
ইরান যুদ্ধে মার্কিন রণতরীর অতিরিক্ত ব্যবহার, বাড়ছে সামরিক চাপ
যেসব এলাকায় আজ ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না
আজ যেসব জেলায় ভারী বৃষ্টির আভাস