ভারতে এলপিজি সংকট, সমাধানে ৪ জটিল পদ্ধতি

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

এলপিজি (LPG) সংকট কোনো সাময়িক অসুবিধা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সরবরাহ জরুরি অবস্থা যার কোনো সহজ সমাধান নেই। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-র প্রভাবে বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ৩৯ দিনের যুদ্ধের পর ৮ এপ্রিল সকালে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও, ইজরায়েলের লেবানন আক্রমণের ফলে পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী তা একবার খুলে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।

যুদ্ধবিরতি কি স্থায়ী হবে

সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সমাধান হলো হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়া। ইসলামাবাদে শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জ্যারেড কুশনারের মতো ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত থাকবেন। তবে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) সতর্ক করেছে যে, প্রণালিটি "উন্মুক্ত" ঘোষণা করা হলেও বীমা এবং নিরাপত্তার কারণে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগবে। বর্তমানে প্রায় ৮০০ জাহাজ সেখানে আটকা পড়ে আছে। এছাড়া, বিকল্প উৎস হিসেবে আমেরিকা থেকে ভারতে এলপিজি পৌঁছাতে প্রায় ৫ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে, যা তাৎক্ষণিক সংকট মেটাতে অক্ষম।

বিকল্প পাইপলাইন কি সমাধান

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু পাইপলাইন রয়েছে যা হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে চলে। তবে এখানে একটি বড় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা আছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-র মতে, এই পাইপলাইনগুলো কেবল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য তৈরি। এলপিজি বা এলএনজি (LNG) এই পাইপলাইন দিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে তেল সরবরাহ কিছুটা সচল হলেও রান্নার গ্যাসের সংকট থেকেই যাচ্ছে।

নতুন সরবরাহকারীর সন্ধান

ভারত বর্তমানে রাশিয়া, জাপান এবং এমনকি দীর্ঘ বিরতির পর ইরান থেকেও এলপিজি আমদানির চেষ্টা করছে। আমেরিকার দেওয়া বিশেষ 'স্যাংশন ওয়েভার' বা নিষেধাজ্ঞায় ছাড়ের ফলে ভারত সরাসরি ইরান থেকে জ্বালানি কিনছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মাসিক চাহিদা প্রায় ২৬ লক্ষ টন, যা মেটানো বর্তমানে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরবর্তী দেশগুলো থেকে ছোট ছোট কার্গোতে গ্যাস এনে এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না।

রান্নার পদ্ধতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন

দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে ভারত সরকার পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (PNG) এবং ইলেকট্রিক কুকিং বা আবেশন উনুন (Induction stove) ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। বর্তমানে ভারতে ৩৩ কোটির বেশি সক্রিয় এলপিজি সংযোগ রয়েছে। এত বিশাল সংখ্যক পরিবারকে রাতারাতি বিদ্যুৎ বা পাইপলাইন গ্যাসে স্থানান্তরিত করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তবে বর্তমান সংকট সাধারণ মানুষকে বিকল্প জ্বালানি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।

ভারতের বর্তমান চিত্র

পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেলের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভারত ১.১৫৮ মিলিয়ন টন এলপিজি উৎপাদন করেছে, যেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল এর দ্বিগুণ। মার্চ মাসে আমদানি ৪৬ শতাংশ কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে সরকার। দিল্লি, মুম্বাই এবং বেঙ্গালুরুর মতো শহরে হাজার হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে অথবা কয়লা ও কাঠের উনুনে ফিরে গেছে। ‘অপরিহার্য পণ্য আইন’ (Essential Commodities Act) প্রয়োগ করে মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।

যদিও 'এমটি শিবালিক' এবং 'এমটি নন্দা দেবী'র মতো আটটি ভারতীয় জাহাজ কোনোমতে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে, তবুও যুদ্ধের মেঘ না কাটলে ভারতের ৩৩ কোটি পরিবারের রান্নাঘরের অনিশ্চয়তা কাটছে না। সূত্র: টাইমস নাও

SN
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত