সাংবাদিকতায় ‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’, গাজার খবরে কী মনোযোগ কমছে?

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

বিশ্বজুড়ে একের পর এক যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের খবরের ভিড়ে তৈরি হচ্ছে ‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’ বা সংকট-অবসাদ। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের যুদ্ধ ও ধ্বংসের খবর দেখতে দেখতে দর্শক-পাঠকের একাংশ যেমন আগ্রহ হারাচ্ছেন, তেমনি সংবাদমাধ্যমকেও নতুন ঘটনা ও নতুন সংকটের দিকে মনোযোগ সরাতে হচ্ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও ইয়েমেনের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকটে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথম কয়েক মাস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গাজা ছিল অন্যতম প্রধান খবর। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদচক্রে নতুন সংকট ও নতুন ঘটনার জায়গা তৈরি হয়। ফলে গাজার খবরের অগ্রাধিকার ও দৃশ্যমানতা ওঠানামা করতে থাকে।

তবে গাজা সংবাদমাধ্যম থেকে হারিয়ে গেছে এমনটা বলা ঠিক হবে না। 'মিডিয়া জার্নালিজম রিসার্চ সেন্টার'-এর ২০২৫ সালের 'হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস কভারেজ রিপোর্ট'-এ ১০টি বড় মানবিক সংকট নিয়ে ৭৮ হাজারের বেশি সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, গাজা ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত সংকটগুলোর একটি; গাজা নিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৫৮.৫টি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। একই গবেষণায় ইউক্রেন নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৯.৪টি, কঙ্গো নিয়ে ১.৫টি এবং চাদ নিয়ে মাত্র ০.০৬টি সংবাদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ সংকটের গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক সংবাদে তার উপস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

কেন তৈরি হয় ‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’?

সাংবাদিকতায় ‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’ বলতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংকটের প্রতি দর্শক-পাঠকের মনোযোগ ও আবেগ ধীরে ধীরে কমে যাওয়াকে বোঝানো হয়। একই ধরনের ধ্বংস, নিহতের সংখ্যা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয়ের খবর বারবার সামনে এলে অনেক মানুষের মধ্যে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।

রয়টার্স ইনস্টিটিউটের 'ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৫'-এ বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে মানুষ ক্রমেই সংবাদ এড়িয়ে চলছেন। প্রতিবেদনে সংবাদ এড়িয়ে চলার অন্যতম কারণ হিসেবে নেতিবাচক সংবাদ, অতিরিক্ত তথ্যের চাপ এবং সংবাদে আগ্রহ হারানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে প্রায় '৪০ শতাংশ মানুষ কখনো কখনো বা প্রায়ই সংবাদ এড়িয়ে চলেন' বলে উল্লেখ করা হয়।

২০২৬ সালের 'ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট'-এও সংবাদ ব্যবহারের কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এখন সংবাদ পাওয়ার বড় উৎস হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালে সপ্তাহে সামাজিক ও ভিডিও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সংবাদ নেওয়ার হার ৫৪ শতাংশ, টেলিভিশনের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশ এবং সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, দর্শকের মনোযোগ এখন আগের তুলনায় আরও বেশি খণ্ডিত।

গাজার ক্ষেত্রে কী ঘটছে?

গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতা কমেনি, কিন্তু সংবাদচক্র বদলেছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে প্রতিটি বড় হামলা, জিম্মি, স্থল অভিযান কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল ‘ব্রেকিং নিউজ’। সময়ের সঙ্গে একই ধরনের হামলা ও মানবিক বিপর্যয় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলে সংবাদমূল্যের দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলো আগের মতো দীর্ঘ সময় প্রধান শিরোনামে থাকে না।

গাজা নিয়ে GDELT -এর টেলিভিশন সংবাদ বিশ্লেষণেও এমন ওঠানামা দেখা যায়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বিশ্ব সেন্ট্রাল কিচেনের কর্মীদের নিহত হওয়ার পর গাজা নিয়ে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদে হঠাৎ করে বড় ধরনের মনোযোগ ফিরে আসে। পরে আবার সেই মাত্রা কমে যায়। অর্থাৎ বড় ও নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে দীর্ঘস্থায়ী সংকট আবারও সংবাদচক্রের কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারে।

২০২৫ সালের মানবিক সংকটবিষয়ক গবেষণাও দেখিয়েছে, গাজা তখনও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংবাদকভার হওয়া সংকটগুলোর একটি। ফলে এখানে মূল বিষয় খবরের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়; বরং খবরের অগ্রাধিকার, স্থায়িত্ব এবং দৃশ্যমানতার পরিবর্তন।

শুধু গাজা নয়

ইউক্রেন: ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউক্রেন ছিল বিশ্বের প্রধান সংবাদ। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের সামরিক হামলা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার খবরের সংবাদমূল্য অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। তবে বড় হামলা, শান্তি আলোচনা বা যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটলে আবারও আন্তর্জাতিক মনোযোগ বেড়ে যায়। ২০২৫ সালের 'হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস কভারেজ রিপোর্ট'-এ ইউক্রেন ছিল দ্বিতীয় সর্বাধিক আলোচিত মানবিক সংকট।

সুদান: ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদে সুদান গাজা বা ইউক্রেনের তুলনায় অনেক কম জায়গা পেয়েছে। 'রয়টার্স'-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে' বলা হয়, যুদ্ধের কারণে সুদানের ২৭টি সংবাদপত্র, ৩২টি রেডিও স্টেশন ও আটটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ১ হাজার সাংবাদিক চাকরি হারান। ফলে সেখানে সংকটের খবর তৈরি ও আন্তর্জাতিকভাবে পৌঁছানো দুটিই কঠিন হয়ে পড়ে।

ইয়েমেন: দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও মানবিক সংকট থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক সংবাদ কাভারেজ অনেক সময় বেড়েছে নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ঘটনার কারণে। বিশেষ করে হুথিদের লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা ইয়েমেনকে আবারও আন্তর্জাতিক সংবাদে সামনে এনেছে। অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের চেয়ে নতুন সামরিক বা ভূরাজনৈতিক ঘটনার সংবাদমূল্য অনেক সময় বেশি হয়ে ওঠে।

কঙ্গো ও চাদ: আন্তর্জাতিক সংবাদে সংকটের অসম দৃশ্যমানতার আরও দুটি উদাহরণ এগুলো। 'হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস কভারেজ রিপোর্ট ২০২৫' অনুযায়ী, কঙ্গোর সংকট নিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১.৫টি এবং চাদ নিয়ে ০.০৬টি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অথচ দুই দেশেই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও মানবিক সংকট রয়েছে।

সংকট হারিয়ে যায়, নাকি সংবাদচক্র এগিয়ে যায়?

একটি যুদ্ধ প্রধান শিরোনাম থেকে সরে গেলেই সেই সংকট শেষ হয়ে যায় না। বরং অনেক সময় 'সংকট চলতে থাকে, কিন্তু সংবাদচক্র সামনে এগিয়ে যায়।'

গাজার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশে সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় সাংবাদিকদের নিরাপত্তাঝুঁকি এবং তথ্য যাচাইয়ের সমস্যা মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতাকে কঠিন করে তুলেছে। 'কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় অন্তত '২০৭ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন'। এর মধ্যে অন্তত ৩২ জনকে তাঁদের সাংবাদিকতার কারণে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে সিপিজে-এর মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি সংবাদ সংগ্রহের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। ফলে কোনো সংকটের সংবাদ কম দৃশ্যমান হওয়ার পেছনে শুধু দর্শকের আগ্রহ কমে যাওয়া নয়, 'মাঠে তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতাও' গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’ কি শুধু দর্শকের সমস্যা?

না। এর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক চাপ, সীমিত জনবল, দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার প্রতিযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম, সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার নিরাপত্তা সবকিছুই যুক্ত।

তাই গাজার মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু ‘বিশ্ব ভুলে গেছে কি না’-এমন সরল নয়। বরং প্রশ্ন হলো, 'একই ভয়াবহতা যখন প্রতিদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন সেটি কতটা নতুন সংবাদ হিসেবে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।'

আর এখানেই ‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’ গুরুত্বপূর্ণ। সংকট শেষ না হলেও তার 'সংবাদমূল্য, দৃশ্যমানতা ও আন্তর্জাতিক মনোযোগের মাত্রা বদলে যেতে পারে'। গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে বিশ্বের মনোযোগ এখন শুধু কোথায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ভুগছে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং কোথায় নতুন ঘটনা ঘটছে, কোথায় রাজনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হচ্ছে এবং কোন সংকট দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে সেটিও বড় ভূমিকা রাখছে।

এমএ
আরও পড়ুন