ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকার যদি পদত্যাগ করেন, কিংবা কোনো কারণে ক্ষমতায় থাকার অবস্থায় না থাকেন, তাহলে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান কে হবেন—সেনাবাহিনীর প্রধান, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, নাকি অন্য কেউ? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে রাজনৈতিক জল্পনার বদলে দেখতে হবে ভারতের সংবিধান কী বলছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে ভারতের সেনাপ্রধান বা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারপ্রধান হয়ে যান না। ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, যিনি লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন অর্জন করতে পারেন। বিকল্প সরকার গঠনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলাও সাংবিধানিক রীতির অংশ।
তবে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করা, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, প্রধানমন্ত্রী সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হওয়া এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া—এগুলো এক পরিস্থিতি নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনি প্রশ্ন ও করণীয় আলাদা।
১. প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে কী হবে?
ভারতের সংবিধানের ৭৫ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও মন্ত্রিসভার দায়িত্ব সম্পর্কে বিধান রয়েছে। অনুচ্ছেদটির ১ নম্বর দফা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। আর ৭৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে লোকসভার কাছে দায়বদ্ধ।
অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে সরকারপ্রধান নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো বিধান নেই। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বিকল্প সরকার গঠনের ব্যবস্থা করবেন।
ভারতে এর বাস্তব নজিরও রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ জুন নরেন্দ্র মোদী রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে তাঁর ও মন্ত্রিসভার পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ গ্রহণ করলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত মোদী ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেন।
২০০৯ সালেও মনমোহন সিংয়ের পদত্যাগের পর বিকল্প ব্যবস্থা কার্যকর হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্বে থাকতে অনুরোধ করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল।
এ থেকে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেই রাষ্ট্র পরিচালনায় শূন্যতা তৈরি হয় না। নতুন সরকার গঠনের আগপর্যন্ত বিদায়ী সরকার দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারে।
২. বিকল্প প্রধানমন্ত্রী কে হবেন?
প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতিকে এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে, যিনি লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পেতে সক্ষম বলে প্রতীয়মান হন।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি তিনটি:
- ক্ষমতাসীন জোটের বিকল্প নেতা: মোদী পদত্যাগ করলেও তাঁর দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলে সেই জোটের অন্য কোনো নেতা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।
- বিরোধী জোটের নেতা: ক্ষমতাসীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে এবং বিরোধী দল বা জোট প্রয়োজনীয় সমর্থন দেখাতে পারলে তাদের নেতা সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন।
- কোনো পক্ষের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে: রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিক রীতি ও প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এমন প্রার্থীকে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে হবে, যিনি লোকসভায় আস্থা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবেন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের ২০২৪ সালের সরকারি বিবৃতি এবং ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ব্যাখ্যায় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বিকল্প সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
৩. তাহলে কি সেনাপ্রধান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হতে পারবেন?
প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন বা সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে—শুধু এই কারণে সেনাপ্রধানের সরকারপ্রধান হওয়ার কোনো সাংবিধানিক অধিকার সৃষ্টি হয় না।
ভারতের সংবিধানের ৫৩ অনুচ্ছেদে কেন্দ্রীয় নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কত্বও রাষ্ট্রপতির হাতে রাখা হয়েছে। কিন্তু এই বিধান সেনাবাহিনীকে নির্বাচিত সরকার সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দেয় না।
ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক সরকারের ভূমিকা আলাদা। সেনাবাহিনীর দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা; প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার দায়িত্ব সংবিধান অনুযায়ী সরকার পরিচালনা করা।
সেনাবাহিনী নিজে থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করলে সেটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া হবে না। এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার বৈধতা ও পরিণতি আলাদা আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
৪. সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কি সরকারপ্রধান হতে পারবেন?
এ ক্ষেত্রেও উত্তর—প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হন না।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যা ও আইনসম্মতভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা বিচার করার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিচার বিভাগের প্রধানের পদ এবং প্রধানমন্ত্রী পদ এক নয়। সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সাংবিধানিক বিবরণেও ভারতের শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের পৃথক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম আছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি—দুজনের পদই একসঙ্গে শূন্য হয়ে গেলে ১৯৬৯ সালের President (Discharge of Functions) Act অনুযায়ী, ভারতের প্রধান বিচারপতি অথবা তিনি অনুপস্থিত থাকলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠতম উপলব্ধ বিচারপতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এখানে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: বিচারপতি বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন; কিন্তু সেই বিধান তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান বানায় না।
৫. মোদী সরকার ‘পালিয়ে গেলে’ কী হবে?
এখানে ‘পালিয়ে যাওয়া’ কথাটির আইনি অর্থ পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যাওয়া, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়া এবং গোটা সরকার কার্যত ভেঙে পড়া—এগুলো এক বিষয় নয়।
পরিস্থিতি সাংবিধানিকভাবে সম্ভাব্য ব্যবস্থা
প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতি বিকল্প সরকার গঠনের ব্যবস্থা করবেন; বিদায়ী সরকারকে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলা হতে পারে।
ক্ষমতাসীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় বিকল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে সক্ষম নেতাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম দায়িত্ব বণ্টন ও সরকারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রাসঙ্গিক সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিবেচিত হবে।
রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি উভয়ের পদ শূন্য ১৯৬৯ সালের আইনে নির্ধারিত ব্যবস্থায় প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
সেনাবাহিনী নিজে থেকে ক্ষমতা দখল করে এটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক উত্তরাধিকার নয়; এর বৈধতা গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্নের বিষয় হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার: ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাই কেন্দ্রীয় সরকারের মূল নির্বাহী নেতৃত্ব। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বকে প্রধানমন্ত্রীর পদে সরাসরি রূপান্তর করা যায় না।
৬. তাহলে ভারতের সংবিধানের মূল কথা কী?
ভারতের সংবিধান সরকারপ্রধানের পদ শূন্য হলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেই সেনাপ্রধান বা প্রধান বিচারপতির হাতে সরকার চলে যাবে—এমন কোনো সাধারণ বিধান নেই।
রাষ্ট্রপতি বিকল্প সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করবেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম নেতাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করবেন। আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের দায়িত্ব পালন করবেন—বিশেষ আইনগত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ব্যতিক্রম ছাড়া।
সুতরাং, প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর: মোদী সরকার পদত্যাগ করলে বা ক্ষমতা ছাড়লে ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হওয়ার স্বাভাবিক সাংবিধানিক পথ হলো বিকল্প প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ—সেনাপ্রধান বা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরকারপ্রধান বানানো নয়।
সূত্র
1. ভারতের সংবিধান — India Code
2. রাষ্ট্রপতি ভবন: ৫ জুন ২০২৪, মোদীর পদত্যাগ ও নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত দায়িত্ব চালানোর অনুরোধ
3. রাষ্ট্রপতি ভবন: ২০০৯ সালে মনমোহন সিংয়ের পদত্যাগ-পরবর্তী ব্যবস্থা
4. ভারতের সুপ্রিম কোর্ট: সংবিধান ও বিচার বিভাগের ভূমিকা
5. President (Discharge of Functions) Act, 1969 — প্রাসঙ্গিক আইন
প্রবাসীদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে 'বিশেষ আদালত' গঠনের পরিকল্পনা
হুথিরা কারা, কেন সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে?
'ব্রেকিং ব্যাড' খ্যাত অভিনেতা আরজে মেটি আর নেই
নেদারল্যান্ডসকে ‘ইহুদিবিদ্বেষের হটস্পট’ বললো ইসরায়েল
ফ্রিজে হ্যাকারদের হামলা, ইউরোপজুড়ে নজিরবিহীন সাইবার তাণ্ডব