জাকাত দেওয়া যাবে যেসব আত্মীয়কে

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৩ এএম

জাকাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত এবং ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানদের ওপর প্রতি বছর জাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। জাকাতের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও অভাবী মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হলে তাকে জাকাত দেওয়া বিশেষভাবে উত্তম। এতে একদিকে ফরজ ইবাদত আদায় হয়, অন্যদিকে আত্মীয়তার সম্পর্কও সুদৃঢ় হয়।

কুরআনের নির্দেশনায় জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তি

পবিত্র কুরআনে জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত আট শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

‘নিশ্চয়ই সদকা (জাকাত) হলো ফকির, মিসকিন, এতে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয়, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে ব্যয় এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তওবা: আয়াত ৬০)

এই আয়াত অনুযায়ী জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত আট শ্রেণির মানুষ হলেন—

১. ফকির: যার কাছে জীবনধারণের মতো সম্পদ নেই।

২. মিসকিন: যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই।

৩. জাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী।

৪. নওমুসলিম বা আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি, যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা প্রয়োজন।

৫. দাস বা বন্দি, যারা মুক্তি লাভের জন্য অর্থের প্রয়োজন।

৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, যিনি ঋণ পরিশোধে অক্ষম।

৭. আল্লাহর পথে নিয়োজিত ব্যক্তি, যেমন দ্বীন প্রতিষ্ঠা বা জিহাদের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি।

৮. মুসাফির, যিনি নিজ দেশে ধনী হলেও সফর অবস্থায় অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং দেশে ফিরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।

যেসব আত্মীয়কে জাকাত দেওয়া যায়

আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ যদি এই শ্রেণিগুলোর অন্তর্ভুক্ত হন, তাহলে তাকে জাকাত দেওয়া বৈধ। এ ছাড়াও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যাদের জাকাত দেওয়া বৈধ। তারা হলেন—

১. ভাই-বোন

২. চাচা-চাচি

৩. মামা-মামি

৪. খালা-খালু

৫. ফুফু-ফুফা

৬. শ্বশুর-শাশুড়ি

এসব আত্মীয়দের মধ্যে অভাবী কেউ থাকলে তাকে জাকাত দেওয়া বেশি উত্তম। এতে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ

‘গরিবকে দান করলে তা শুধু সদকা হয়; আর আত্মীয়কে দান করলে তা দুটি সওয়াব—সদকা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।’ (মুসনাদে আহমাদ ১৫৭৯৪, নাসাঈ ২৫৮২)

যেসব আত্মীয়কে জাকাত দেওয়া যাবে না

তবে কিছু আত্মীয়কে জাকাত দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। তারা অভাবী হলেও জাকাত দেওয়া যাবে না; বরং নিজের সাধারণ সম্পদ থেকে তাদের সাহায্য করা কর্তব্য। তারা হলেন—

১. উর্ধ্বতন আত্মীয়

যেমন— বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, পরদাদা-পরদাদি, পরনানা-পরনানি এবং এভাবে ওপরের দিকে যত আত্মীয় রয়েছেন।

২. অধস্তন আত্মীয়

যেমন— পুত্র-কন্যা, নাতি-নাতনি, দৌহিত্র-দৌহিত্রী এবং এভাবে নিচের দিকে যত বংশধর রয়েছেন।

৩. স্বামী-স্ত্রী

স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে জাকাত দিতে পারে না।

এই তিন ধরনের আত্মীয় যদি অভাবগ্রস্ত হন, তাহলে নিজের সম্পদ থেকে তাদের সহযোগিতা করা দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হবে।

জাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত

জাকাত ইসলামের ফরজ বিধান। প্রত্যেক স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্পদশালী মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর জাকাত আদায় করা ওয়াজিব। কেউ যদি পূর্ণ এক বছর নেসাব পরিমাণ বর্ধনশীল সম্পদের মালিক থাকে, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। নেসাব হলো—

> প্রায় ৭.৫ তোলা (৮৭.৪৫ গ্রাম) স্বর্ণ, অথবা

> প্রায় ৫২.৫ তোলা (৬১২.৩৫ গ্রাম) রৌপ্য, অথবা

> এ পরিমাণ স্বর্ণের মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক সম্পদ।

নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য বা ব্যবসায়িক সম্পদ যেদিন নেসাব পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেদিন থেকেই জাকাতের হিসাব শুরু হবে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিন যে পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ৪০ ভাগের ১ ভাগ (২.৫%) জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।

জাকাত আদায়ের সময়

হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বছরে একবার জাকাতের হিসাব করতে হয়। আমাদের দেশে অনেকেই রমজান মাসে জাকাত হিসাব করে থাকেন। জাকাত হিসাব করার পর পুরো অর্থ একসঙ্গে আদায় করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে তা আদায় করা যায়।

জাকাত শুধু আর্থিক ইবাদত নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যারা প্রকৃত অভাবগ্রস্ত, তাদের জাকাত দিলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায় এবং পারিবারিক বন্ধনও দৃঢ় হয়। তাই শরিয়তের বিধান মেনে সঠিক ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া প্রত্যেক সম্পদশালী মুসলমানের দায়িত্ব।

HN
আরও পড়ুন