বিবিসির প্রতিবেদন

হারিয়ে যাচ্ছে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ‘ডাব্বাওয়ালা’

আপডেট : ৩০ মে ২০২৬, ০১:০০ পিএম

শত বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে মুম্বাইয়ের লাখো চাকুরিজীবীর মুখে ঘরের গরম খাবার তুলে দিয়েছেন তারা। রোদ, ঝড় কিংবা চড়া রোদ; কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাদের নিখুঁত পথচলা। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন মুম্বাইয়ের সেই ঐতিহ্যবাহী ‘ডাব্বাওয়ালা’রা। করোনা মহামারি, প্রযুক্তির ছোঁয়া আর বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার ধাক্কায় শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি এখন বিলুপ্তির পথে।

রেলস্টেশনের চত্বরে সাদা জামা আর মাথায় টুপি পরা একদল মানুষ সাইকেলের পেছনে সারি সারি টিফিন বক্স বেঁধে ছুটে চলেছেন, মুম্বাই শহরের প্রতিদিনের খুব চেনা এক ছবি ছিল এটি। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল এক অদ্ভুত ও নিখুঁত কোডিং পদ্ধতি। কোনো আধুনিক অ্যাপ বা জিপিএস ছাড়াই শুধু আলফানিউমেরিক কোডের ওপর ভরসা করে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ঘরে তৈরি খাবার সঠিক সময়ে সঠিক অফিসে পৌঁছে দিতেন এই ডাব্বাওয়ালারা। তাদের এই অবিশ্বাস্য নিখুঁত লজিস্টিকস পদ্ধতি নিয়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল গবেষণা করেছে, এমনকি মুগ্ধ হয়েছিলেন ব্রিটেনের বর্তমান রাজা চার্লসও।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না এই প্রাচীন ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালেও যেখানে মুম্বাইয়ে নিবন্ধিত ডাব্বাওয়ালার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার, আজ তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দেড় হাজারে। এই ধসের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে করোনাকালীন লকডাউনকে। মহামারির সময়ে অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ ঘরে বসেই কাজ করা শুরু করে। পরবর্তীতে অফিস খুললেও বর্তমানে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা হাইব্রিড মডেলের কারণে আগের মতো প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার হার অনেক কমে গেছে। ফলে ডাব্বাওয়ালাদের গ্রাহক সংখ্যায় বড় ধরনের ধস নামে।

এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন। বর্তমানে জোমাটো বা সুইগির মতো অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের সহজলভ্যতা এবং ক্লাউড কিচেনগুলোর সস্তা ও বৈচিত্র্যময় খাবারের বিজ্ঞাপনের ভিড়ে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঘরের সাধারণ খাবারের চাহিদা। এক সময় মাসে মাত্র দুই হাজার রুপির বিনিময়ে যারা পুরো শহরের দুপুরের খাবারের দায়িত্ব নিতেন, আজ তারা এক আঙুলের স্পর্শে চলে আসা বার্গার বা বিরিয়ানির সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না।

এই পেশা ছেড়ে অনেকেই এখন জীবিকার তাগিদে অন্য পথ বেছে নিচ্ছেন। দীর্ঘ বিশ বছর ডাব্বাওয়ালার কাজ করা অনেকে এখন বাধ্য হয়ে অটো রিকশা চালাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ পরিবারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে দিন-রাত মিলিয়ে দুটি করে চাকরি করছেন। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত টিফিন বক্সের কাজ শেষ করে অনেকেই রাতের বেলা অন্য কোনো সংস্থায় পার্ট-টাইম কাজ করছেন।

মুম্বাই টিফিন বক্স সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শহরের সব এলাকায় এখন আর আগের মতো সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা এখন শিফট-ভিত্তিক কাজের কথা ভাবছেন, যাতে কর্মীরা ডেলিভারির পাশাপাশি অন্য কোনো ব্যবসা বা কাজ করতে পারেন। তবে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাটি আর কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে খোদ অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাই আজ চরম শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। আধুনিকতার তীব্র গতিতে মুম্বাইয়ের এই ঐতিহ্যবাহী লজিস্টিকস মাস্টারক্লাসটি শেষ পর্যন্ত কেবল ইতিহাসের পাতায় বা জাদুঘরেই স্থান পায় কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

NB
আরও পড়ুন