বিশ্বকাপে পানি পানের নতুন নিয়ম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রায় সব খেলাতেই এসেছে নানা ধরনের আধুনিক নিয়ম। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রেফারিংয়ের ভুল কমানো এখন ক্রীড়া প্রশাসকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ক্রিকেটে যেমন ডিআরএস প্রযুক্তি আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করেছে, তেমনি ফুটবলে ভিএআর ব্যবস্থাও একই উদ্দেশ্যে চালু হয়েছে। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় ফাউল সংক্রান্ত নিয়মও আগের তুলনায় অনেক কঠোর করা হয়েছে।

তবে এবারের বিশ্বকাপে নতুন করে চালু হওয়া বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এতদিন ফুটবল ছিল মূলত দুই অর্ধের খেলা, যেখানে ৯০ মিনিটের ম্যাচে মাঝখানে থাকত ১৫ মিনিটের বিরতি। কিন্তু এখন প্রথমার্ধের মাঝামাঝি এবং দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি তিন মিনিট করে অতিরিক্ত বিরতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে কার্যত দুই ভাগের ফুটবল চার ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।

অন্যান্য খেলায় টাইমআউটের ধারণা নতুন নয়। ক্রিকেটের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, বাস্কেটবল কিংবা আমেরিকান ফুটবলে নিয়মিত বিরতির প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ফুটবলে বাধ্যতামূলকভাবে এমন বিরতি দেওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে নতুন।

২০১৪ বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরমের কারণে কিছু ম্যাচে ‘কুলিং ব্রেক’ দেওয়া হয়েছিল। তবে তখন এটি ছিল পরিস্থিতিভেদে রেফারির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এবার সেটিই ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নামে ফিরেছে এবং আবহাওয়া বা স্টেডিয়ামের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন, তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেও এই নিয়ম কার্যকর থাকায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না।

ফিফার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের শরীরে পানির ঘাটতি, ক্লান্তি ও তাপজনিত ঝুঁকি কমানোর জন্য এই বিরতি প্রয়োজন। আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের শারীরিক পরিশ্রম আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে পানি পান করলে তাদের কর্মক্ষমতা বজায় রাখা এবং ইনজুরির ঝুঁকি কমানো সম্ভব—এমন যুক্তিও দেওয়া হচ্ছে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, আগে কি খেলোয়াড়রা পানি পান করতে পারতেন না? বাস্তবে থ্রো-ইন, কর্নার কিংবা ইনজুরির সময় খেলোয়াড়রা সাইডলাইনে গিয়ে পানি খেতেন। গোলরক্ষকদেরও পোস্টের পাশে পানির বোতল রাখার অনুমতি ছিল। ফলে আলাদা করে খেলা থামানোর প্রয়োজন হতো না এবং ম্যাচের স্বাভাবিক গতি অক্ষুণ্ণ থাকত।

এ কারণেই অনেকের ধারণা, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের বিষয়টি সামনে আনা হলেও এর পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থই বেশি কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সমর্থক অভিযোগ তুলেছেন যে এই বিরতিগুলো মূলত সম্প্রচারকারীদের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।

এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক ফুটবল ব্যক্তিত্বও। নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক বলেছেন, বিরতির সময় টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখানো তার মোটেও ভালো লাগে না। একইভাবে সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ মনে করেন, স্পনসরদের সুবিধার জন্য তৈরি এমন বিরতি ম্যাচের স্বাভাবিক গতি ও ছন্দ নষ্ট করতে পারে।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এর অবিরাম গতি ও উত্তেজনা। একটি দল যখন আক্রমণের ধারায় থাকে, তখন তারা বিশেষ এক ছন্দ বা মোমেন্টাম তৈরি করে। ঘন ঘন বিরতি সেই ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং খেলোয়াড়দের মনোযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান সময়ে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি বিশাল বাণিজ্যিক শিল্পেও পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপের মতো আসর কোটি কোটি দর্শক উপভোগ করেন, আর সম্প্রচার স্বত্ব ও বিজ্ঞাপন থেকে আয় হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। ফলে প্রতি ম্যাচে অতিরিক্ত কয়েক মিনিটের বিরতি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বিজ্ঞাপন সময় তৈরি করছে, যা থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।

ফলে প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—এই বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক কি সত্যিই খেলোয়াড়দের সুস্থতার জন্য, নাকি এটি মূলত বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের নতুন একটি মাধ্যম?

AHA
আরও পড়ুন