মানবতার আসল যোদ্ধা: রক্তদান আন্দোলনের পথিকৃৎ হেলাল উদ্দিন

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ১০:২৭ এএম

কেউ সমাজসেবা করেন দায়িত্ববোধ থেকে, কেউ করেন মানবিক তাগিদে। তবে গাজীপুরের কাপাসিয়ার মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের কাছে সমাজসেবা যেন জীবনেরই একটি অংশ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরবে-নিভৃতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার মানবতার এক নির্ভরতার নাম। কাপাসিয়া সদর ইউনিয়নের বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা তিনি। 

ছাত্রজীবন থেকেই সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হেলাল উদ্দিন। ২০০৩ সালে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় স্থানীয় মুরব্বিদের আস্থায় কাপাসিয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে তিনি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদানের উদ্যোগ নেন। শুধু শিক্ষা নয়, অনেক শিক্ষার্থীর খাতা-কলম ও শিক্ষাসামগ্রীও নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করে দিতেন।

২০১২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী ও অরাজনৈতিক সংগঠন “রক্তদান সেবা সংঘ কাপাসিয়া”। তখন কাপাসিয়ায় রক্তদান সম্পর্কে সচেতনতা ছিল খুবই কম। নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

সেই সময়ের কথা স্মরণ করে হেলাল উদ্দিন বলেন, "কাপাসিয়ায় প্রথম আমরাই রক্তদানভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলি। তখন অনেক মানুষ মনে করতেন রক্তদান করলে শরীরের ক্ষতি হয়। আমরা যখন সংগঠনের কাজে বের হতাম, অনেকেই বলতেন এলাকার ছেলে-মেয়েদের নষ্ট করে দিচ্ছি। এমনকি আমার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। পরে যখন তাদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের রক্তের প্রয়োজন হলো এবং আমরা সহযোগিতা করলাম, তখন ধীরে ধীরে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে।"

প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটির মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হয়েছে। অসংখ্য রোগী, প্রসূতি মা, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি এবং জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচাতে এই রক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ব্যক্তিগতভাবেও তিনি ৩৫ বার এ পজিটিভ (A+) রক্তদান করেছেন, যা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

কাপাসিয়ার ভাকোয়াদি গ্রামের বাসিন্দা রোকসানা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি গর্ভবতী হওয়ার পর হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক সিজারের জন্য দুই ব্যাগ রক্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। আমার স্বামী হেলাল ভাইকে ফোন করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। সেদিন সময়মতো রক্ত না পেলে কী হতো জানি না। আমরা তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।

কাপাসিয়া সদর এলাকার বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, আমার স্ত্রী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। চিকিৎসার ব্যয় বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখন হেলাল উদ্দিন ও তার সংগঠন আর্থিক সহযোগিতা করে আমাদের পাশে দাঁড়ায়। তাদের সহযোগিতা না পেলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যেত।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, হেলাল উদ্দিনকে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিনি। রাত হোক কিংবা দিন, কারও রক্ত লাগলে তিনি ফোন ধরেন। নিজের কাজ ফেলে মানুষের জন্য ছুটে যান। এমন মানুষ সমাজে খুব কম দেখা যায়।

রক্তদান সেবা সংঘের স্বেচ্ছাসেবক মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা অনেকেই হেলাল ভাইকে দেখে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হয়েছি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের জন্য কাজ করলে কোনো প্রতিদান আশা করতে হয় না। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোই সবচেয়ে বড় অর্জন।

শুধু রক্তদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি হেলাল উদ্দিন। ২০১৭ সালে জামালপুরের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১১ লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি ও তার সংগঠনের সদস্যরা। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে নোয়াখালীর বন্যাকবলিত এলাকাতেও ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

সংগঠনের উদ্যোগে দুইজন স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও একজন ব্রেইন টিউমার রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে। পাশাপাশি দুইজন এতিম মেয়ের বিয়ের সম্পূর্ণ খরচ বহন করে তাদের নতুন জীবনের পথ সুগম করা হয়েছে।

বর্তমানেও রক্তদান, চিকিৎসা সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন হেলাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করব। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানবসেবার কাজ চালিয়ে যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ।

স্থানীয়দের মতে, নিঃস্বার্থ মানবসেবা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন শুধু একজন সমাজকর্মী নন, বরং কাপাসিয়ার মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার এই পথচলা নতুন প্রজন্মকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করছে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

YA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত