ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন থেকে আলোচিত ডেভিড ইমন

‘পাগলা ইমুন্ন্যা’ থেকে আলোচিত ডেভিড ইমন

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম ইমনের। বাবা মো. মুসা। পেশায় কৃষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট ছিল ইমনের নেশা।

তার নানা বাড়ী ফটিকছড়ি পৌরসভার ৯নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর ধুরুং কাশেম ডাক্টারের বাড়ি। 

মামা তৌহিদ বলেন, ‘ইমন সম্পর্কের ভাগিনা! অপরাজনীতিই আজ তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে’।

নানা বাড়ির স্থানীয় ইমাম আবু হানিফা মাদ্রাসা মাঠে অনুশীলন করতে এসে মাদরাসা শিক্ষকদের বকা শুনা পাগলা ইমন্ন্যা। (সে সময় ইমনকে শান্ত-স্বভাবের, বোকাসোকা, ক্রিকেটপাগলা হিসেবে সবাই জানত)।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ডেভিড ইমন নামেও পরিচিত, এখন আলোচনায় একাধিক ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবে।

মামার ভাষ্য, অত্যন্ত দুঃখজনক!—একসময় যে ছিল সম্ভাবনাময় একজন ক্রিকেটার, আজ তার এমন পরিণতি সত্যিই কষ্ট দেয়। ছোটবেলা থেকেই তার ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। তার স্বপ্ন পূরণের জন্য বাবা-মা তাকে শহরে পাঠিয়েছিলেন, যাতে সে ক্রিকেটে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। শুরুটাও ছিল আশাব্যঞ্জক। পরে শুনেছিলাম, সে তৎকালীন চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছিল। হয়তো সেই সূত্রে ক্রিকেটে আরও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল।

এরপর তাকে ফটিকছড়ির তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু তৈয়বের সঙ্গেও চলাফেরা করতে দেখা যায়।

৫ আগস্টের আগেই তার বাবার শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে ওমানে পাঠানো হয়। তখন তার মা আমাকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন, যেন আমি তার জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করি এবং তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে সঠিক পথে চলার পরামর্শ দিই।

আমি তাকে ডেকে অনেক বুঝিয়েছি, ভালো-মন্দ বোঝানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন নিয়ে কঠোরভাবে সতর্কও করেছি। এমনকি তার জন্য Ooredoo-তে একটি চাকরির ব্যবস্থাও করেছিলাম।

কিন্তু সে আমার কথা না শুনে দেশে ফিরে যায়। এরপর সময়ের পরিক্রমায় আজ তার এই পরিণতি।

ফটিকছড়ি পৌরসভার আবু হানিফা মাদ্রাসার এক সাবেক শিক্ষক বলেন, ‘ইমন মাঝে-মধ্যেই আমাদের মাদ্রাসা মাঠে ক্রিকেট অনুশীলন করত। তখন তাকে শান্ত-স্বভাবের, ভদ্র ও ক্রিকেটপাগল এক তরুণ হিসেবেই আমরা চিনতাম।একবার গভীর রাতে মাদ্রাসার পুকুরপাড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কারণে তাকে বকাঝকাও করেছি। তখনও ভাবিনি, ছেলেটির জীবন একসময় এমন মোড় নেবে।’

তার নানা বাড়িতে সম্পর্কে নানিরা বলেন, ইমন্ন্যা দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। আমরা জানি ইমন্ন্যা শহরে ব্যবসা করে অনেক টাকা ইনকাম করে, গত কয়েক মাস ধরে শুনি পাগলা পার্টি করে, গতকাল শুনি পাগলকে পুলিশে ধরছে।

সব দোষ হাসন্নির(শেখ হাসিনা)'র ছেলা তৈয়্যুবের, তার কারনে বোকাসোকা এ ছেলেটার জীবন নষ্ট হয়েছে। আবু তৈয়্যুব  গ্রুপের ছেলেদের সাথে ইমন্ন্যার বেশাবেশি আড্ডা ছিলো।

তার এলাকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য জানা যায়,  ক্রিকেটে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রাম শহরের ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। নিয়মিত অনুশীলন করতেন বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউরী এলাকায়।

বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ বোলিংয়ের কারণে দ্রুত নজর কাড়েন। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবকে অনুসরণ করতেন তিনি।

তার একান্ত পরিচিত কয়েকজন ভাষ্য, ধারাবাহিকভাবে অনুশীলনের সুযোগ পেলে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সামর্থ্য ছিল তার। কিন্তু কাঞ্চনপুরের তার এলাকাবাসী জানান ইমন ছেলেটা স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পারিবারিক আর্থিক সংকট। বাবার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, পরিবারের দায়িত্ব এবং ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় বহন করতে না পারায় ধীরে ধীরে মাঠ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন ইমন এবং এলাকাবাসীসহ আত্মীয় স্বজন সবার থেকে দূরে সরে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবারের একাধিক সদস্যরা জানান, ইমনকে পরিবারের উদ্যোগে ওমানে পাঠানো হয়েছে এবং ভালো একটি চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে স্থায়ী না হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসে। অনেক বুঝিয়েছিলাম। ভালোভাবে জীবন গড়তে। তার ছোট একটা ভাই এখনো লেখা পড়া করে, অবিবাহিত একজন বোনও রয়েছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে ডেভিড ইমনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে।পরবর্তীতে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি এবং অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় তদন্তের সূত্র ধরে যশোরে অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে।

ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান বলেন, গত কাল তার অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, সে ফটিকছড়ি থানায় ওয়ারেন্ট ভুক্ত হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার পালাতক আসামি।

AHA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত