'নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্যের কারণেই যুদ্ধ ঠেকিয়েছে ইরান'

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

যুদ্ধের সময় ইরানের জনগণের অংশগ্রহণ, শহীদ সর্বোচ্চ নেতার বিচক্ষণ নেতৃত্ব এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার অব্যাহত দিকনির্দেশনার কারণেই দেশটি দৃঢ়ভাবে টিকে থাকতে পেরেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের সরকারের তৃতীয় বছর শুরুর উপলক্ষে এসব কথা বলেন তিনি। পেজেশকিয়ান বলেন, হামলা শুরুর আগে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছিল শত্রুপক্ষ। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও ব্যবহার করা হয়েছিল। ইরানের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা খাতে তখন গুরুতর চাপ থাকায় শত্রুপক্ষের হিসাবকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যায় না। তবে এত চাপের মধ্যেও ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখা এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সংহতি জোরদার করাকে ইরানের অন্যতম প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, মিসর, আজারবাইজান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের কথা বলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।

আলোচনা ও শান্তির সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে যে কাঠামো নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল একটি বড় অর্জন। পরিষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে ১২ জনই ওই প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি, ইরানের জব্দ করা অর্থ, বিনিয়োগ এবং লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে পারস্পরিক কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল।

তবে অপর পক্ষ তাদের কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় ওই সমঝোতা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল বলে দাবি করেন পেজেশকিয়ান। পরে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

হরমুজ প্রণালি নিয়েও বক্তব্য দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, একটি সম্মত কাঠামোর অধীনে অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত।

পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান আলোচনা চালিয়ে যাবে, তবে প্রতিপক্ষের ওপর সীমাহীন আস্থা রাখবে না। অপর পক্ষ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে ইরানও তা করবে। অন্যথায় তেহরান পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। তাঁর মতে, অব্যাহত সংঘাতের চেয়ে সংলাপ অনেক বেশি কার্যকর এবং এর মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।

পররাষ্ট্রনীতির চাপের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের রপ্তানি ও আমদানি কমেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় বেড়েছে। ব্যাংকিং, তেল ও বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধের কারণে আমদানির খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার বিনিময় হারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞার কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব নেই, এমন দাবি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার বিরোধ সংলাপের মাধ্যমে সমাধান এবং সম্মিলিতভাবে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ঠেকানোর আহ্বান জানান তিনি।

দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংক, বিমা তহবিল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে নানা সমস্যা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি হলেও সরকার বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমাতে এবং জরুরি সেবা সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জ্বালানি সাশ্রয়, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন পেজেশকিয়ান। এর অংশ হিসেবে দূর থেকে কাজের সুযোগ বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো, জ্বালানি সাশ্রয়ী যানবাহন ও বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল আমদানি এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ইলেকট্রনিক খাদ্য ভাউচার কর্মসূচি সম্প্রসারণে সরকারের উদ্যোগের কথা জানালেও অর্থসংকটের কারণে এতে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা পরিবারগুলোর আবাসন সহায়তা দেওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান।

প্রশাসনে বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষেও মত দেন তিনি। রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে দক্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, অর্থনৈতিক, শিল্প ও প্রশাসনিক দায়িত্বগুলোকে দলীয় বা গোষ্ঠীগত বিবেচনার পরিবর্তে যোগ্য পেশাজীবীদের হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়েও কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে পারিবারিক চিকিৎসক কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাঠামোগত, আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত বিভিন্ন বাধার কথা উল্লেখ করেন। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে জবাবদিহি এবং পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুদ্ধের পর পুনর্গঠন কার্যক্রমের বিষয়েও তথ্য দেন পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, জনগণের অংশগ্রহণে হাজার হাজার স্কুল নির্মাণের কাজ চলছে এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামতের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে জনগণ ও জাতীয় ঐক্যের কথা তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। তিনি সতর্ক করে বলেন, অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি হলে তা দেশের সামরিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে। বিপরীতে জাতীয় সংহতি বজায় রাখা গেলে অর্থনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করে ইরান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন