মমতাময়ী প্রকৃতির মহাবিস্ময় আঞ্জেল জলপ্রপাত!

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম

পৃথিবীর প্রাকৃতিক বিস্ময়গুলোর মধ্যে জলপ্রপাতের সৌন্দর্য ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব দুটোই অনন্য। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নদী নেমে এসেছে, কোথাও আবার হাজার মিটার উঁচু থেকে জলধারা সরাসরি শূন্যে ঝাঁপ দিয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনিজুয়েলায় অবস্থিত আঞ্জেল জলপ্রপাত এমনই এক বিস্ময়। স্থানীয় পেমোন জনগোষ্ঠীর ভাষায় যার নাম কেরেপাকুপাই মেরু।

আউয়ান-তেপুই নামের এক বিশাল টেবিল আকৃতির পর্বতের খাড়া প্রাচীর বেয়ে নেমে আসা এই জলপ্রপাত তার উচ্চতা, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, জীববৈচিত্র্য ও দুর্গমতার কারণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রচলিত হিসাবে এর মোট উচ্চতা ৯৭৯ মিটার বা ৩ হাজার ২১২ ফুট। তবে এর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো প্রায় ৮০৭ মিটারের একটানা জলপতন—যা পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন জলপ্রপাত হিসেবে স্বীকৃত।

আউয়ান-তেপুইয়ের বুক থেকে নেমে আসে জলধারা

আঞ্জেল জলপ্রপাত দক্ষিণ-পূর্ব ভেনিজুয়েলার বলিভার রাজ্যের কানাইমা জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত। এলাকাটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং এখানকার ভূপ্রকৃতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘তেপুই’—চারপাশে খাড়া দেয়ালের মতো উঁচু এবং ওপরের অংশ তুলনামূলক সমতল পর্বত।

প্রপাতটি অবস্থিত আউয়ান-তেপুইয়ের খাড়া প্রাচীরে। স্থানীয়ভাবে এই পর্বতকে ‘শয়তানের পর্বত’ও বলা হয়। এর চূড়ায় জমা হওয়া বৃষ্টির পানি ছোট ছোট জলধারায় পরিণত হয়ে রিও কেরেপাকুপাই মেরু নদীর সৃষ্টি করে। সেই জলধারা পাহাড়ের কিনারা থেকে সরাসরি নিচে নেমে আসে এবং পরে চুরুন নদীতে মিশে যায়। চুরুন নদী আবার কারাও নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ওরিনোকো নদী অববাহিকার অংশ হয়ে যায়।

অর্থাৎ আঞ্জেল জলপ্রপাত কেবল একটি বিচ্ছিন্ন জলধারা নয়; এটি একটি বৃহৎ নদী ও জলাধার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বৃষ্টিই যার প্রধান জ্বালানি

আঞ্জেল জলপ্রপাতের পানির প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করে আউয়ান-তেপুইয়ের ওপর বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর। আটলান্টিক মহাসাগর ও আমাজন অববাহিকা থেকে আসা আর্দ্র বাতাস তেপুইয়ের উঁচু মালভূমিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়। উচ্চতার কারণে বাতাস ঠান্ডা হলে ঘনীভবন ঘটে এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।

বর্ষাকালে, সাধারণত মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত, জলপ্রপাতের প্রবাহ অনেক বেড়ে যায়। তখন পাহাড়ের নিচের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলকণা ও কুয়াশার ঘন আস্তরণ তৈরি হয়। দূর থেকে মনে হয়, পাহাড়ের চূড়া থেকে যেন মেঘের ভেতর দিয়ে পানি নেমে আসছে।

শুষ্ক মৌসুমে অবশ্য দৃশ্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত কমে গেলে জলপ্রপাতের প্রবাহও অনেক কমে যায়। কখনো কখনো ওপর থেকে পড়া পানি প্রবল বাতাসে সূক্ষ্ম কণায় পরিণত হয়ে নিচে পৌঁছানোর আগেই কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ে।

৯৭৯ মিটার উচ্চতার রহস্য

আঞ্জেল জলপ্রপাতের মোট উচ্চতা ৯৭৯ মিটার হলেও পুরোটা একটানা পতন নয়। প্রধান জলধারা প্রায় ৮০৭ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করে অবিচ্ছিন্নভাবে নিচে নামে। এরপর পানি খাড়া পাথুরে ঢাল ও ক্যাসকেডের মধ্য দিয়ে প্রায় ৪০০ মিটার পথ অতিক্রম করে। পরে আরও প্রায় ৩০ মিটার উচ্চতার একটি ছোট পতন পেরিয়ে চুরুন নদীতে পৌঁছায়।

এই কাঠামোর কারণেই জলপ্রপাতের ‘মোট উচ্চতা’ এবং ‘একক অবিচ্ছিন্ন পতন’—দুটি পরিমাপ আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্বের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত—তবে বিতর্কও আছে

আঞ্জেল জলপ্রপাত দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে মার্কিন সাংবাদিক রুথ রবার্টসনের নেতৃত্বে এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অর্থায়নে পরিচালিত অভিযানে এর উচ্চতা বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করা হয়। জরিপে মোট উচ্চতা পাওয়া যায় ৯৭৯ মিটার।

তবে পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকার টুগেলা জলপ্রপাতকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। আধুনিক জরিপে টুগেলার মোট উচ্চতা ৯৮৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে একাধিক ধাপের মোট উচ্চতা বিবেচনায় টুগেলা আঞ্জেলকে সামান্য ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে একটানা পতনের ক্ষেত্রে আঞ্জেলের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলকভাবে কম। প্রায় ৮০৭ মিটারের অবিচ্ছিন্ন পতন টুগেলার দীর্ঘতম একক পতনের তুলনায় অনেক বেশি। তাই ‘সর্বোচ্চ মোট জলপ্রপাত’ এবং ‘দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন জলপতন’—এই দুই শ্রেণিকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

নামের পেছনে রয়েছে রোমাঞ্চকর গল্প

বিশ্বের কাছে আঞ্জেল জলপ্রপাতের পরিচিতি মূলত মার্কিন বৈমানিক জেমস ‘জিমি’ আঞ্জেলের মাধ্যমে। ১৯৩৩ সালে সোনার সন্ধানে বিমান নিয়ে অঞ্চলটি অতিক্রম করার সময় তিনি বিশাল জলপ্রপাতটি দেখতে পান।

এর কয়েক বছর পর, ১৯৩৭ সালের ৯ অক্টোবর তিনি স্ত্রী ও সহযোগীদের নিয়ে ‘ফ্লেমিংগো’ নামের বিমান নিয়ে আউয়ান-তেপুইয়ের ওপর অবতরণের চেষ্টা করেন। বিমানটি পাহাড়ের ওপর দুর্ঘটনায় আটকে যায়। যদিও অভিযাত্রীদের কেউ গুরুতর আহত হননি, দুর্গম পাহাড় ও ঘন জঙ্গল পেরিয়ে নিচে নামতে তাদের প্রায় ১১ দিন সময় লাগে।

এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর জিমি আঞ্জেলের নামেই জলপ্রপাতটি বিশ্বজুড়ে ‘আঞ্জেল ফলস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

তবে স্থানীয় পেমোন জনগোষ্ঠীর কাছে এটি বহু আগে থেকেই পরিচিত ছিল। তাদের ভাষায় এর নাম কেরেপাকুপাই মেরু। ২০০৯ সালে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেস জলপ্রপাতটির আদিবাসী নাম ব্যবহারের ওপর জোর দেন। এরপর সরকারি পর্যায়ে ‘কেরেপাকুপাই মেরু’ নামটি আবারও গুরুত্ব পায়। তবু আন্তর্জাতিকভাবে ‘আঞ্জেল ফলস’ নামটিই বেশি প্রচলিত।

তেপুই যেন বিচ্ছিন্ন জীবনের দ্বীপ

আঞ্জেল জলপ্রপাতের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব শুধু তার উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। যে আউয়ান-তেপুইয়ের ওপর এটি অবস্থিত, সেটিই এক অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার।

তেপুইগুলো কোটি কোটি বছর ধরে আশপাশের নিম্নভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে এখানকার প্রাণী ও উদ্ভিদের অনেক প্রজাতি নিজেদের স্বতন্ত্র বিবর্তনীয় পথে বিকশিত হয়েছে। এ কারণে তেপুই অঞ্চলকে অনেক সময় ‘মূল ভূখণ্ডের গ্যালাপাগোস’ বলা হয়।

আউয়ান-তেপুইয়ের ওপরের মাটি অত্যন্ত দরিদ্র। পাথুরে ও ক্ষয়প্রবণ ভূমিতে উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সহজে পাওয়া যায় না। এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে কিছু উদ্ভিদ বিশেষ অভিযোজন তৈরি করেছে। এর মধ্যে মাংসাশী উদ্ভিদ Heliamphora ও Drosera উল্লেখযোগ্য।

শুধু উদ্ভিদ নয়, এখানকার উভচর ও সরীসৃপের মধ্যেও স্থানীয় বা এনডেমিক প্রজাতির উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকেরা আউয়ান-তেপুই থেকে এমন কিছু প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

আরও বিস্ময়কর হলো—মাত্র প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের অন্য একটি তেপুইয়ের সঙ্গে আউয়ান-তেপুইয়ের প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির মিলও খুব কম। অর্থাৎ পাশাপাশি থাকা তেপুইগুলোও যেন আলাদা আলাদা প্রাকৃতিক দ্বীপ।

দুর্গমতার মধ্যেও পর্যটনের আকর্ষণ

আঞ্জেল জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখতে যাওয়া সহজ নয়। ঘন জঙ্গল ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। সাধারণত পর্যটকদের প্রথমে বিমানযোগে কানাইমা এলাকায় যেতে হয়। এরপর নদীপথে স্থানীয় পেমোন গাইডদের পরিচালিত কাঠের নৌকা ‘কুরিয়ারা’—ব্যবহার করে দুর্গম অঞ্চলের দিকে যেতে হয়। শেষ অংশ পাড়ি দিতে হয় পায়ে হেঁটে।

এই দুর্গমতাই আবার জলপ্রপাতটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে। প্রকৃতি, অভিযাত্রা ও চরম ক্রীড়ার অনুরাগীদের কাছে আঞ্জেল জলপ্রপাত একটি বিশেষ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

শুধু পর্যটন নয়, গবেষণারও বিশাল ক্ষেত্র

আঞ্জেল জলপ্রপাতকে ঘিরে গবেষণার পরিধি দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। জলপ্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাত, ভূতাত্ত্বিক ক্ষয়, তেপুইয়ের জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছুই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়।

বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও জলপ্রবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে জলপ্রপাতটির পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্রকৃতির এক অনন্য স্বাক্ষর

আঞ্জেল জলপ্রপাতকে শুধু ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত’ বললে এর পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়, একটি জটিল জলপ্রণালীর অংশ, একটি বিচ্ছিন্ন জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল এবং স্থানীয় পেমোন সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৯৭৯ মিটার উচ্চতার এই জলধারা আউয়ান-তেপুইয়ের খাড়া দেয়াল থেকে যখন নিচে নেমে আসে, তখন সেখানে একসঙ্গে দেখা যায় ভূতত্ত্ব, জলবিজ্ঞান, জলবায়ু ও জীববিবর্তনের অসাধারণ সমন্বয়।

মোট উচ্চতা নিয়ে টুগেলা জলপ্রপাতের সঙ্গে বিতর্ক থাকলেও প্রায় ৮০৭ মিটারের অবিচ্ছিন্ন পতন আঞ্জেলকে এখনও অনন্য করে রেখেছে। আর সেই কারণেই কেরেপাকুপাই মেরু শুধু একটি জলপ্রপাত নয়—এটি পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি ও প্রকৃতির বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত