তিন মাসে খেলাপি ঋণ বাড়লো ১৮ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৮ এএম

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন এই তিন মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ফলে জুন শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে দশমিক ৫২ শতাংশ পয়েন্ট ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জুন শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরেই খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। পরের এক বছরে তা আরও বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা এবং বিতরণ করা বিপুল ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠন ও বিশেষ নীতিগত সুবিধা দিয়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা সম্ভাবনাময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রেখে ঋণ আদায় করাই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। তবে এসব সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ কমার বদলে বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে পুরো ব্যাংকিং খাতকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো কঠিন হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ এক্সিট পলিসির মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য আদায়যোগ্য ঋণগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। তবে নীতিগত ছাড়ের পরও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আগের সরকারের সময়ে বিশেষ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীকে অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া অনেক ঋণ দীর্ঘদিন বিভিন্ন উপায়ে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। বারবার নবায়ন ও পুনঃতপশিলের মাধ্যমে এসব ঋণের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করা হয়। এখন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হওয়ায় প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে। বিশেষ করে বছরের পর বছর নবায়ন করা হলেও মূল টাকা আদায় হয়নি এমন ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে অতীতে আড়ালে থাকা ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।

খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তির ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মুনাফায়। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও কমছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, খেলাপি ঋণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি তারল্য পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ ব্যাংকের বিপুল অর্থ দীর্ঘদিন ধরে অনুৎপাদনশীল খাতে আটকে থাকছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ঋণ পুনঃতপশিল বা নতুন নীতিগত সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণের সমাধান সম্ভব নয়। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ এবং অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, সরকারের দুর্বল নীতি ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দেশে এমন একটি সংস্কৃতি রয়েছে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের সুবিধাভোগী অনেক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে যান বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেড়ান। ফলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া তাদের ঋণ অনাদায়ী থেকে যায়।

তিনি বলেন, যথাযথ তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় একপর্যায়ে এসব অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। এটি দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের ঘাটতিরই প্রতিফলন।

অর্থঋণ আদালতের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতাকেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে খেলাপি ঋণের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত