মাত্র ৫ ঘণ্টায় চাঁদের জন্ম!

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৫ এএম

চাঁদের জন্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণায় নতুন এক চমকপ্রদ তথ্য যোগ হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবীর সঙ্গে ‘থেইয়া’ নামের একটি গ্রহাণু-সদৃশ মহাজাগতিক বস্তুর ভয়াবহ সংঘর্ষের মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই চাঁদের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ, চাঁদের জন্ম প্রক্রিয়া এতটা দীর্ঘ ছিল না-ও হতে পারে, যতটা বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে ধারণা করে আসছিলেন।

বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে মঙ্গল গ্রহের আকারের একটি মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা ওই কাল্পনিক মহাজাগতিক বস্তুর নাম দিয়েছেন ‘থেইয়া’।

ধারণা করা হয়, সেই মহাবিধ্বংসী সংঘর্ষে পৃথিবী ও থেইয়ার বিপুল পরিমাণ পদার্থ ছিটকে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এসব ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ধীরে ধীরে একত্রিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় চাঁদ। এতদিন পর্যন্ত চাঁদের জন্ম সম্পর্কে এটাই ছিল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা। তবে নতুন গবেষণা সেই ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থেইয়া কতটা উত্তপ্ত ছিল এবং তাদের অভ্যন্তরীণ পদার্থ কতটা শক্ত বা দুর্বল ছিল—চাঁদের জন্মের ধরন নির্ধারণে এই দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগের অনেক কম্পিউটার মডেলে বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। নতুন গবেষণায় তাই সংঘর্ষের সময় দুই মহাজাগতিক বস্তুর তাপমাত্রা ও বস্তুগত বৈশিষ্ট্যও হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়েছে।

এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশন। সেখানে সংঘর্ষের মুহূর্তে পৃথিবী ও থেইয়ার তাপমাত্রা, গঠন এবং পদার্থের শক্তিমাত্রার পরিবর্তন বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী অ্যাডিন ডেন্টন। তাঁর মতে, দুটি মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ফল শুধু তাদের আকার ও গতির ওপর নির্ভর করে না; সংঘর্ষের সময় তাদের তাপমাত্রা ও পদার্থের শক্তিও বড় ভূমিকা পালন করে।

সিমুলেশনের ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। দেখা গেছে, সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থেইয়া যত বেশি উত্তপ্ত থাকবে, তাদের পদার্থ তত বেশি দুর্বল ও সহজে বিকৃত হওয়ার মতো হয়ে উঠবে। বিপরীতে, তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা বস্তু অনেক বেশি শক্ত থাকতে পারে। ফলে একই ধরনের সংঘর্ষ হলেও এর ফল একেক পরিস্থিতিতে একেক রকম হতে পারে।

কিছু সিমুলেশনে দেখা গেছে, সংঘর্ষের ফলে পৃথিবী ও থেইয়ার বিপুল পরিমাণ পদার্থ ছিটকে গিয়ে পৃথিবীকে ঘিরে একটি ধ্বংসাবশেষের বলয় তৈরি করতে পারে। পরে সেই বলয়ের পদার্থ ধীরে ধীরে একত্রিত হয়ে চাঁদের জন্ম দিতে পারে। এই চিত্রটি অনেকটা চাঁদের জন্ম সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সব সিমুলেশনের ফল একই ছিল না।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংঘর্ষের মাত্র প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই পৃথিবীকে ঘিরে একটি অক্ষত চাঁদ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, চাঁদের জন্মের জন্য বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষকে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে একত্রিত হওয়ার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

গবেষণার এই ফল চাঁদের জন্ম সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ করে দিচ্ছে। এতদিন মনে করা হতো, থেইয়ার সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের পর চাঁদ তৈরি হতে উল্লেখযোগ্য সময় লেগেছিল। নতুন সিমুলেশন বলছে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে চাঁদের গঠন অত্যন্ত দ্রুতও ঘটতে পারে।

তবে গবেষকরা এটিকে চাঁদের জন্মের চূড়ান্ত ও একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি চাঁদ সৃষ্টির সম্ভাব্য একটি নতুন দৃশ্যপট। কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরনের চাঁদ তৈরি হতে পারে, তা আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য ভবিষ্যতে উন্নত মডেল ও চন্দ্রশিলার তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে।

চাঁদের জন্মের রহস্য তাই এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে নতুন এই গবেষণা একটি চমকপ্রদ সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে—পৃথিবীর সঙ্গে এক মহাজাগতিক সংঘর্ষের মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই হয়তো আমাদের চাঁদের জন্ম হয়েছিল।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত