‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও’ লিখে ভাইকে মারধরের ভিডিও পাঠিয়েছিলো স্বামী

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

মুক্তা ইসলামকে নির্যাতনের একটি ভিডিও তার ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার। ভিডিওটির সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল পরানো। তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারধর করছেন সোহেল।

পাশের কক্ষে তখন কাঁদছিল মুক্তার দুই সন্তান। এর দুই দিন পর খিলক্ষেতের বাসা থেকে মুক্তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়।

মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলার প্রধান আসামি মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মামলাটি তদন্ত করছেন খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব ভৌমিক।

মুক্তাকে নির্যাতনের প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও পেয়েছে পুলিশ। ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। সোহেল চামড়ার বেল্ট দিয়ে তাকে একের পর এক আঘাত করছেন।

ভিডিওতে সোহেলকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ এর জবাবে মুক্তা বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’

ভিডিওতে মুক্তার শরীরে আঘাতের দাগও দেখা যায়। নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে ছিল তার দুই সন্তান। তাদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’

পুলিশের ভাষ্য, ১ সেপ্টেম্বর মুক্তাকে মারধরের ভিডিও তার ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন সোহেল। ভিডিও পাঠানোর সঙ্গে মুক্তাকে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়।

তবে এর দুই দিন পর মুক্তার মৃত্যুর খবর পান তার স্বজনেরা। তারা খিলক্ষেতের বাসায় গিয়ে মুক্তাকে জীবিত পাননি। পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।

সোহেলকে গ্রেপ্তারের পর তার মুঠোফোন জব্দ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ফোনেও মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিওটি পাওয়া গেছে।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মুক্তাকে মারধর করা হতো বলে পরিবারের অভিযোগ।

বিয়ের পর থেকেই তাঁদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলছিল বলেও জানিয়েছেন স্বজনেরা। তাঁদের অভিযোগ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ এবং যৌতুকের জন্য সোহেল মুক্তাকে নির্যাতন করতেন। তবে মুক্তা তার ওপর নির্যাতনের বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের তেমন কিছু জানাতেন না।

মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা খিলক্ষেতে বসবাস করতেন।

সোহেল প্রথমে মুদিদোকান চালাতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ব্যবসায় ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য বাড়তে থাকে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজীব ভৌমিক বলেন, মৃত্যুর দুই দিন আগে মুক্তাকে মারধরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ওই মারধরের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান তিনি। তবে সোহেল জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, মুক্তা নিজেই ফাঁস নিয়েছেন।

রাজীব ভৌমিক আরও বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সোহেল শিকদারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মুক্তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলা হবে।

এএম
আরও পড়ুন